তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল গণি এম. এ
প্রাক্তন
বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ-
সরকারী
আশেক মাহমুদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, জামালপুর।
সহযোগিতায়:
অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মদ যোবাইদুল
ইসলাম
ট্রিপল
টাইটেল, এম. এ. ইসলামিক স্টাডিজ, ফাস্ট-ক্লাস
শেরপুর
সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, শেরপুর
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ নূরুল হুদা
ইবনে আবেদ
দাওরায়ে
হাদীস, বি. এ অনার্স, ফার্স্ট-ক্লাস, এম. এম ফাস্ট-ক্লাস
আরাম নগর
কামিল মাদরাসা, সরিষাবাড়ী, জামালপুর
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ শামসুল আলম
এম. এম,
ফার্স্ট ক্লাস
হাজী এশান
মুহাম্মদ কারিগরি কামিল মাদরাসা
শিবগঞ্জ,
চাঁপাই নবাবগঞ্জ
প্রকাশক: অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল
গণি এম. এ
|
সর্বস্বত্ব: লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত
প্রথম সংস্করণঃ ২৪
নভেম্বর ২০০০ ঈসায়ী
দ্বিতীয় সংস্করণঃ ১৮
অক্টোবর ২০০২ ঈসায়ী
তৃতীয় সংস্করণঃ ২৪
সেপ্টেম্বর ২০০৪ ঈসায়ী
৯ আশ্বিন ১৪১১ বাংলা
৯ শা'বান ১৪২৫ হিজরী
রোজ শুক্রবার
মুদ্রণে: তাওহীদ প্রেস
এন্ড পাবলিকেশন্স
২২১, বংশাল রোড, ঢাকা-১১০০
ফোন: ৭১১২৭৬২, মোবাইল: ০১৭১-৬৪৬৩৯৬
মূল্য: ৩৫.০০ (পঁয়ত্রিশ) টাকা মাত্র।
প্রাপ্তিস্থান :
১। বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস- ১৭৬, নবাবপুর রোড, ঢাকা-১১০০, ফোন: ০২-৯৫৬৬৭০৫
২। তাওহীদ পাবলিকেশন্স- ৯০,
হাজী আবদুল্লাহ সরকার লেন (বংশাল), ঢাকা-১১০০, ফোন: ০২-৭১১২৭৬২
৩। হুসাইন আল-মাদানী প্রকাশনী- ৩৮, নর্থ সাউথ রোড (বংশাল), ঢাকা-১১০০, ফোন: ০২-৭১১৪২৩৮
৪। সেকান্দার হোমিও হল- ৩/২,
পুরানা পল্টন, ঢাকা। ফোন: ০২-৯৩৩৯২০৭
৫। প্রীতি ঘর লাইব্রেরী- বকুলতলা, জামালপুর।
৬। মাদ্রাসা দারুল হাদীস- শেখের ভিটা, জামালপুর।
৭। অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল গণি- সেকান্দর মহল, নয়াপাড়া, জামালপুর। ফোন: ০৯৮১-৬২৪৭৭
|
আলহামদু
লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। শত কোটি দরূদ, সালাম ও সলাত বিশ্ব নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-
(সাঃ) এর প্রতি। পূর্ণাঙ্গ ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য সকল মুসলমানেরই ঈমানী
দায়িত্ব রয়েছে। দেশে বিদেশে ইসলামের প্রচার হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম কারো মনগড়া ধর্ম ও
জীবন ব্যবস্থা নয়। এটা বিশ্ব প্রভু আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা বা দ্বীন।
আর এ দ্বীন প্রচারিত হয়েছিল নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মাধ্যমে। এ দ্বীনের মূলমন্ত্র
হচ্ছে কালেমায়ে তাইয়েবা। যাতে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ
(সাঃ) হচ্ছেন আল্লাহ্র রাসূল।
রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) কর্তৃক প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত আদর্শ ও নীতি যা পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফে সংরক্ষিত
রয়েছে তাই আমাদের জন্য একমাত্র অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। সকল মুসলমানকে যা বিশেষ গুরুত্ব
সহকারে অনুসরণ করতে হবে তার মূল কথা হচ্ছে তাওহীদ ও সুন্নাতের অনুসরণ।
কিন্তু
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, দীর্ঘ চৌদ্দশত বছর অতিক্রমের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী
মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ ক্রমশই পরিবর্তিত হয়ে আসছে। মুসলিম সমাজে ক্রমশই
আল্লাহ প্রদত্ত আল কুরআন ও সুন্নাতে নাববীর নির্ধারিত দ্বীনের পরিবর্তে কিছু মনগড়া
নবাবিষ্কৃত আদর্শ ও নীতি অনুপ্রবেশ করছে।
ফলে ইসলামের
মূলমন্ত্র তাওহীদের পরিবর্তে শির্ক ও সুন্নাহর পরিবর্তে বিদআতের প্রবর্তন ঘটছে ব্যাপক
হারে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা প্রক্ত ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছি যা আল্লাহ নির্দেশিত
ও তাঁর রাসুল কর্তৃক প্রদর্শিত নয়।
আমরা অনেক
ক্ষেত্রেই যা প্রকৃত ইসলাম নয় সেটাকেই ইসলাম মনে করছি। বিশেষ করে যারা ইসলাম প্রচারের
কাজে নিয়োজিত ও দ্বীনী তাবলীগের মেহনত করছেন তাঁদের পক্ষে আল্লাহর কুরআন ও তাঁর রাসূলের
সহীহ্ হাদীসের অনুসরণ করেই প্রচার ও তাবলীগ করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশতঃ
দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের মধ্যে তাওহীদ ও সুন্নাহর পরিবর্তে শির্ক ও বিদআতের প্রাদুর্ভাব
ঘটছে।
ইসলামের
নামে মুসলিম সমাজে বহু দল ও উপদলের সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের মধ্যে দ্বীন-ইসলামের ব্যাখ্যা
হচ্ছে বিভিন্নভাবে। পরিণামে বিশ্ব নাবী (সাঃ) মদীনা থেকে যে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন আমরা তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
ভূমিকায়
এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। তাই ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে বিশেষ
দাবীদার তাবলীগ জামাত সম্পর্কেই আপাতত: যৎকিঞ্চিত আলোচনার উদ্দেশেই আমাদের এই প্রয়াস।
তাবলীগ
জামাতের দেশী ও বিদেশী বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আমীরগণের সাথে আলোচনা এবং এই জামাতের
উল্লেখযোগ্য বই পুস্তক পাঠ করে এবং কুরআন, হাদীস, বিশ্বস্ত ইতিহাস ও অন্যান্য বই পুস্তক
পাঠ করে তাবলীগে দ্বীন সম্পর্কে আমি যা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছি তাই নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে
এই পুস্তিকায় প্রকাশ করলাম।
|
হয়তো বা
ইসলামের প্রতি তাঁদের আগ্রহের আতিশয্য, জ্ঞানের অপূর্ণতা, অন্ধবিশ্বাস ও অন্ধ অনুসরণের
নীতি এবং অনুসন্ধান ছাড়াই আমীর ও মুরুব্বীদের অনুকরণ-অনুসরণ, ইত্যাদি কারণেই তাঁদের
কার্যকলাপ এবং মৌখিক ও বই-পুস্তকের মাধ্যমে তাবলীগের কাজে কিছু শির্ক, বিদআত ও গুমরাহী
প্রকাশ পাচ্ছে।
আমাদের
প্রকাশিত এই বইটিতে যুক্তি, প্রমাণ ও তাবলীগ জামাতের প্রকাশিত ও প্রচারিত বই পুস্তকের
পৃষ্ঠাসহ তাঁদের ত্রুটি-বিচ্যুতি, ভুল-ভ্রান্তি ও দুর্বলতা দেখানো হয়েছে এবং এই ব্যাপারে
আমরা কুরআন, হাদীস, তাফসীর, বিশ্বস্ত ইতিহাস এবং আরও মূল্যবান কেতাবসমূহের পৃষ্ঠাসহ
উল্লেখপূর্বক আমাদের বক্তব্য রেখেছি।
আল কুরআন
ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে আমরা আশা করবো যে, মুসলিম উম্মাহর যে কোন ব্যক্তি, দল, উপদল,
'ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজে আত্মনিয়োগ করছেন তাঁরা সবাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
নির্দেশিত একমাত্র পথ তথা কুরআন ও সহীহ্ হাদীসের অনুরসণ করবেন, তবেই আমরা কামিয়াবী
হাসিল করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের
এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যদি উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক হয় তাহলে আমরা মনে করবো যে আমাদের পরিশ্রম
সার্থক হয়েছে। আল্লাহ যেন আমাদের এই অকিঞ্চিতকর প্রচেষ্টাকে সফল করেন। আমীন!
আমাদের
এই লেখাটি সাপ্তাহিক আরাফাতের ১৯৯৯-২০০০ সনের ২০ তম সংখ্যা হতে ২৪ তম সংখ্যা পর্যন্ত
ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল অনেক আগ্রহী পাঠক এই লেখাটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশের
অনুরোধ করেছিলেন। তাঁদের অনুরোধ ও দ্বীনী খেদমতের উদ্দেশে এটা পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত
হওয়ায় রাহমানুর রাহীম রাব্বুল আলামীনের বারগাহে জানাই লাখো শুকরিয়া।
যারা এই
পুস্তিকা প্রকাশে সহায়তা করেছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন তাঁদের সবাইকে জানাই আমাদের কৃতজ্ঞতা।
আমাদের
প্রকাশিত এই পুস্তিকায় যদি কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে এবং কেউ যদি তা আমাদেরকে জানান
তাহলে আমরা পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধন করবো ইনশাআল্লাহ।
তারিখ: ২২ নভেম্বর ২০০০ ইং মুহাম্মদ আবদুল গণি
মিয়াপাড়া, জামালপুর, বাংলাদেশ
০৬
দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা
দ্বিতীয়
সংস্করণের লেখায় যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে বা ছাপায় ভুল হয়ে থাকে,
তাহলে অনুগ্রহ করে সুহৃদয় পাঠক-পাঠিকাগণ আমাকে জানালে তৃতীয় সংস্করণে তা সংশোধন করা
হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ্র
মনোনীত পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা দ্বীন ইসলামের সঠিক প্রচার ও প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে আমাদের
এই যতকিঞ্চিত প্রচেষ্টা রাহমানুর রাহীম রাব্বুল আলামীন সফল করুন, আমাদেরকে বরকত মণ্ডিত
করুন, এটাই আমাদের প্রার্থনা, আমীন! সুম্মা আমীন!
তারিখ:
১৮ অক্টোবর ২০০২ ইং মুহাম্মদ আবদুল গণি
মিয়াপাড়া, জামালপুর,
বাংলাদেশ
|
|
আল হামদুলিল্লাহি
রাব্বিল আলামীন ওয়াস সলাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলিহিল কারীম। আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে
বইটির ২য় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার দু'বছর পর আমরা তার তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ করলাম। আল্লাহর
শুকরিয়া এই জন্য যে, ক্রমেই বইটির চাহিদা বেড়ে চলেছে এবং বইটির পুনর্মুদ্রণের অনুরোধ
আসছে। অনেক পাঠক পাঠিকার মতে বাংলা দেশের ১২ কোটি মুসলমানের ঘরে ঘরে বইটি পৌঁছানো প্রয়োজন,
যাতে করে আমরা শির্ক, বিদআত, গুমরাহী এবং অন্ধ অনুসরণ ও অন্ধ অনুকরণ থেকে নিজেদেরকে
হেফাজত করে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাতে নাব্বীর অনুসরণ করে দ্বীন ও দুনিয়ার কামিয়াবী হাসিল
করতে পারি।
আমরা আশা করি যে,
যারা বিভিন্নভাবে তাবলীগের কাজে নিয়োজিত আছেন, পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত
করার জন্য এবং সকল ধর্মের উপর ইসলাম ধর্মকে বিজয়ী করার মহান সংগ্রাম ও সাধনায় যারা
আত্মনিয়োগ করেছেন এবং যারা ইসলামের শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্র 'নস্যাৎ করে, বিশ্ব দরবারে
মুক্তি, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির একমাত্র দিশারী ইসলামকে জয়যুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক
জদ্দ-জিহাদ চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের পাথেয় হিসাবে আমাদের এই বইটি যথেষ্ট সহায়ক হবে। এই
উদ্দেশ্য সাধনে বইটির ব্যাপক প্রচার ও পঠন-পাঠনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য সকল
মুসলমান ভাই বোনের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন রইলো।
বইটিতে অনিচ্ছাকৃত
ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এবং পরবর্তী সংস্করণে ইনশাআল্লাহ আমরা অনিচ্ছাকৃত
ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে নিব।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন
যেন প্রকৃত ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার এই মহান প্রচেষ্টায় আমাদেরকে কামিয়াব করেন।
এই প্রার্থনা করেই শেষ করছি।
"আল্লাহুম্মা
তাকাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলীম ওয়াতুব আলাইনা ইন্নাকা আনতাত তাওয়াবুর
রাহীম" আমীন!
তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০০৪ ইং মুহাম্মদ আবদুল গণি
মিয়াপাড়া, জামালপুর, বাংলাদেশ
|
|
|
|||||
|
তাবলীগ জামাতের পরিচিতি: ৯পৃঃ এই জামাতের নীতিমালা: ৯পৃঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)
এর তরীকার পরিবর্তে অন্যের তরীকা অনুসরণ: ১০পৃঃ কুরআন ও সহীহ হাদীসে
তাবলীগের দিক নির্দেশনা: ১০পূঃ কাদের নিকট তাবলীগ
করতে হবে: ১১পৃঃ আল কুরআনের আলোকে কারা,
কী। তাবলীগ করবে:: : ১১পৃঃ কোন্ কাজ সৎ আর কোন
কাজ অসৎ: ১২পৃঃ আনুগত্য করতে হবে কার?
উলুল আমর প্রসঙ্গ: ১২পৃঃ উলুল আমর:: : ১৩পৃঃ তাবলীগসহ সর্ব ব্যাপারে
একমাত্র আল্লাহ ও তদীয় রাসূলেরই (সাঃ) অনুসরণ
করতে হবেঃ ১৯পৃঃ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ
আলোচনা: ১৯পৃঃ তাবলীগ জামাতের নীতি:
১৯পৃঃ মৌখিক প্রচারের নমুনা: ১৯পৃঃ টঙ্গীর আখেরী মুনাজাত:
কর্মহীন দোওয়ার ফল নেই: ২০পূঃ চিল্লা পদ্ধতির দলিল
কোথায়: ২০পৃঃ কুরআন হাদীসের আলোচনার
অনীহা: ২১পৃঃ আকীদায় শির্ক ও শির্ক
কাজে উৎসাহ প্রদান: ২১পূঃ ভ্রান্ত আকীদাসমূহের
যতকিঞ্চিত পর্যালোচনা: ২৩পৃঃ জান্নাতী হবেন যারা
তাদের সম্পর্কে আল কুরআন: ২৩পৃঃ তাদের প্রচারিত শির্রকের
আরো কিছু নমুনা ২৫পৃঃ শির্ক প্রসঙ্গে হাদীস:
২৬পৃঃ শির্কের বিস্তার ল
বিস্তার লাভ: ২৬পৃঃ ইলাহ এর পরিচিতি।
: ২৬পৃঃ শির্ক কাকে কা বলে:
২৭পৃঃ আল্লাহ কর্তৃক শির্ক
পরিত্যাগ করার নির্দেশ: ২৭পৃঃ শির্ক ও তার পরিণতি: ২৭পৃঃ তাবলীগ জামাতে জামাতে
বিদআত ও গুমরাহীর অনুপ্রবেশ: ২৮পৃঃ তাবলীগ জামাতে বিদআতের
নমুনা: ২৮পৃঃ হুজুর (সাঃ) এর মল-মূত্র,
রক্ত সব কিছুই পাক পবিত্র: ৩১পৃঃ উদ্দেশ্যমূলক ভুল অনুবাদ:
৩২পৃঃ ছয় উসুল ও পাঁচ মূল
স্তম্ভঃ ৩২পৃঃ ৫টি মূল ভিত্তির ৩টিই
বর্জন: ৩৩পৃঃ ছয় উসুলের প্রেক্ষিতে
টঙ্গীর বিশ্ব এজতেমা হজ্জ ও জেহাদ প্রসঙ্গ: ৩৩পৃঃ ৪৯ কোটি সওয়াব মিলে:
৩৪পৃঃ হাদীসের নামে মিথ্যা
রচনাকারীর পরিণতি ৩৪পৃঃ তাদের লেখা দরূদের
ফজিলতের বহুলাংশ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক তার সর্বনাশা
পরিণতি: ৩৫পৃঃ মারাত্মক ও সর্বনাশা
বিবরণ: ৩৫পৃঃ সজাগ হোন: ৩৬পৃঃ |
দরূদের বানোয়াট অসীম
গুরুত্বের ফলে এবাদতবে নিষ্প্রয়োজন করা হয়েছে:
৩৬পূঃ একবার দরূদ পাঠে ৭০
হাজার পাপীর বেহেশত লাভঃ ৩৭পৃঃ কাল্পনিক কেচ্ছা কাহিনী ও স্বপ্নের বিবরণীই
তাবলীগ জামাতের ভিত্তি: ৩৭পৃঃ শরীয়ত ও বিদআত: ৩৮পৃঃ বিদআতের ব্যাখ্যায়
কুরআন, হাদীস ও আয়েম্মায়ে দ্বীন: ৩৮পৃঃ বিদআত ও এর পরিণাম
ফল: ৩৯পৃঃ আল্লামা আলী নাদভীর
বক্তব্য ৪০পৃঃ ইমাম মালেকের উক্তি:
৪৩পৃঃ ইমাম গাজ্জালীর মন্তব্য:
88পৃঃ আখেরী যামানার তাবলীগী
দলের স্বভাব, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সহীহ হাদীসের
বর্ণনা: ৪৪পৃঃ হাদীসের বর্ণনা: ৪৫পৃঃ মূর্খের আনুগত্য: ৪৫পৃঃ প্রমাণ বিহীন ফজিলতের
বায়ান: ৪৫পৃঃ কুরআনের পরিবর্তে নিজস্ব
পথে চলবেঃ ৪৫পৃঃ বহ্যিক আকর্ষণে আকৃষ্ট:
৪৬পৃঃ ব্যাঘ্রের অন্তরের
মত কুরআন হাদীসের কথা তাদের অন্তরে ঢুকবে না: ৪৬পৃঃ তাদের প্রশিক্ষণে আল্লাহ
ও রাসূলের পরিবর্তে জামাতের আনুগত্যঃ ৪৬পৃঃ উল্লেখিত জামাতটি চিনবার
উপায়: ৪৭পৃঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)
বললেন, এই ইসলাম বহির্ভূত জামাত চিনাবার উপায় হলোঃ ৪৭পৃঃ দাওয়াত ও আদেশ নিষেধের
তাৎপর্য: ৪৭পৃঃ দ্বীন প্রতিষ্ঠায় জেহাদের
আহ্বান কুরআন: ৪৮পৃঃ অন্যায় অত্যাচারের
সয়লাব তাবলীগ জামাতের নিষ্ক্রিয়তা: ৪৮পৃঃ ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদী,
খৃষ্টান, ব্রাহ্মাণ্যবাদীদের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র: ৪৯পৃঃ অত্যাচারের প্রতিরোধে
জেহাদ না করায় আল্লাহর প্রশ্ন: ৫১পৃঃ গুজরাটে নজিরবিহীন
নিষ্ঠুরতা ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড এবং আমাদের করণীয়: ৫১পৃঃ গভীর ষড়যন্ত্রের মুখেও
তাবলীগ জামাতের নীরবতা: ৫৩পৃঃ সকল মুসলমানের অপরিহার্য
দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ ৫৩পৃঃ জেহাদ অপেক্ষা দরূদ
পাঠই উত্তম জেহাদের মূলে কুঠারাঘাত: ৫৪পৃঃ আল কুরআনের দীপ্ত ঘোষণা:
৫৪পৃঃ জেহাদে অনীহা প্রকাশের
কারণ: ৫৪পৃঃ কাদিয়ানীদের অনুসরণ:
৫৪পৃঃ পবিত্র কুরআনে জেহাদের
নির্দেশঃ ৫৫পৃঃ জেহাদ সম্পর্কে হাদীস
শরীফ: ৫৭পৃঃ অন্যায় প্রতিরোধে টঙ্গীর
এজতেমায় কোন কথা বলা হয় অন্যায় না কেন? ৫৭পৃঃ ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা
কি নাবীর তরীকা নয়? ৫৮পৃঃ শুধু তাবলীগেই কি নাযাত
পাওয়া যাবে? ৫৮পৃঃ বজ্র কঠিন শপথ নিন:
৫৯পৃঃ |
|||||
|
তাবলীগ জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
তাবলীগ জামাতের পরিচিতি:
এই জামাত একটি দ্বীনী প্রতিষ্ঠান বলে
পরিচিতি লাভ করেছে। এই জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা মুহাঃ ইলিয়াস সাহেব ১৯৪০
সনে এই জামাত প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নিজের ভাষায় বলা যায় যে, তিনি মাদীনা শরীফে স্বপ্নে
নবী (সাঃ) কর্তৃক এই কাজ করার জন্য আদিষ্ট হন এবং তিনি বলেন যে, এই তাবলীগের নিয়মও
তাঁর স্বপ্নে প্রকাশিত হয়- (মালফুজাতে মাওলানা ইলিয়াস, পৃঃ ৫১ এবং তাবলীগী জামাত আওর
উসকা নেসাব, পৃঃ ১৩)। মাওলানা ইলিয়াস সাহেব চার বছর এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে ইন্তেকাল
করেন। তৎপর তাঁর অনুসারীগণ এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন।
এই জামাতের নীতিমালা:
বর্তমান যামানায় যে কোন প্রতিষ্ঠানের
উদ্দেশ্য, নীতি, কার্যক্রম, গঠন পদ্ধতি ইত্যাদি ব্যাপারে একটি লিখিত গঠনতন্ত্র থাকে।
কিন্তু আমার জানামতে তাদের এরূপ কোন গঠনতন্ত্র নেই। তবে মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের নির্দেশক্রমে
মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া সাহেব বিভিন্ন আমলের ফাজায়েলের উপর নয়টি কেতাব রচনা করেছেন।
এর মধ্যে ছয়টি ফাজায়েলের কেতাব ও মাওলানা এহতেশামুল হাসান সাহেবের লেখা পুস্তিকা ওয়াহেদ
এলাজ (অধঃপতনের একমাত্র প্রতিকার) নামক আর একটি কেতাব সমন্বয়ে ফাজায়েলে আমল নামে একটি
সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া মাওলানা জাকারিয়া সাহেবের লেখা ফাজায়েলে হজ্ব ও ফাজায়েলে
দরূদ শরীফ নামে আরও দুইটি কেতাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মাওলানা ইলিয়াস সাহেব মাওলানা
আশরাফ আলী থানবী সাহেবের উল্লেখ করে বলেন, "তিনি অনেক বড় কাজ করেছেন।
তাই আমার মন চায় যে, তালীম তাঁর হোক
এবং তাবলীগের তরীকা আমার হোক"। (মালফুজাত, পৃঃ ৫৭ এবং দ্বীনে ইসলামের তাবলীগ,
মাওলানা আইনুল বারী, পৃঃ ১২)
"মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের উক্ত
আন্তরিক ইচ্ছানুযায়ী ইলিয়াসী তাবলীগের ভিত হওয়া উচিত ছিল মাওলানা আশরাফ আলী থানভী এর
রচনাবলী। সেই হিসেবে উক্ত তাবলীগওয়ালাদের সমবেত তালীমে আশরাফী তরজমা ও তাঁর তাফসীর
বায়ানুল কুরআন এবং মসলা শেখার জন্য তাঁরই রচিত এগার খণ্ড বই বেহেশতী যেওর রাখা উচিত
ছিল না কি?" কিন্তু তা বর্তমানে থানভী রচনাবলী মোতাবেক না হয়ে যাকারিয়া রচনাবলী
মোতাবেক হচ্ছে"। (দেখুন দ্বীনে ইসলামের তাবলীগ, পৃঃ ১৩)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর তরীকার পরিবর্তে অন্যের তরীকা অনুসরণ:
তাবলীগ জামাতের কেতাবসমূহে দেখা যায়
যে, তারা কুরআন ও সুন্নাহর পরিবর্তে প্রায়ই অন্যের আদর্শ ও তরীকার অনুসরণ করছেন। তারা
অনেক ক্ষেত্রে বুজুর্গানে দ্বীন, আউলিয়া, দরবেশ ও সুফীদের পথ অনুসরণের উপর অধিক গুরুত্ব
দিয়েছেন, এছাড়া তাঁরা অনেক ব্যাপারেই স্বপ্নে দেখা বিষয়ের ও কেচ্ছা কাহিনীর উপর অত্যধিক
গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রেই আল কুরআনের নির্দেশ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ)
এর নীতি থেকে দূরে সরে এসে মানুষের মনগড়া নীতির অনুসারী হয়ে পড়েছেন। ফলে তারা অনেক
ক্ষেত্রে শির্ক, বিদআত ও গুমরাহীর পথ প্রশস্ত করেছেন। যথাস্থানে এর প্রমাণ দেওয়া হবে
ইনশাআল্লাহ।
কুরআন ও সহীহ হাদীসে তাবলীগের দিক নির্দেশনা:
১। আল্লাহ বলেন, "হে রাসূল। তোমার
প্রতিপালকের নিকট হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার কর, যদি না কর তবে তো
তুমি তাঁর বার্তা
প্রচার করলে না।" (সূরা মায়েদা-
৬৭)
২। সূরা কাফ এর ৪৫ আয়াতে বলা হচ্ছে,
"অতএব যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে উপদেশ দান কর কুরআনের সাহায্যে"।
৩। সূরা হাশরের ৭ আয়াতে নির্দেশ হচ্ছে,
"রাসূল (সাঃ) তোমাদেরকে যা (নির্দেশ) দেন, তা গ্রহণ কর, আর যা নিষেধ করেন তা থেকে
বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তি দাতা"।
৪। আমার নিকট হতে একটি বিষয়ও যদি তোমার
জানা থাকে তাহলে সেটাও প্রচার করবে। আল হাদীস।
কাদের নিকট তাবলীগ করতে হবে:
১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
"হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে
রক্ষা কর"। (সূরা আত-তাহরীম- ৬৬)
২। পুনরায় বলা হচ্ছে, “ তোমরা স্বজনবর্গকে'
(নিকটতম আত্মীয়দেরকে) সতর্ক করে দাও"। (সূরা আশ-শোআরা-২১৪)
৩। আবার বলা হয়, "এবং তার দ্বারা
(আল কুরআন) তুমি মক্কার ও তার পার্শ্ববর্তী লোকদেরকে সতর্ক কর"। (সূরা আনআম-৯২)
|
৪। পরিশেষে বলা হচ্ছে, "তোমরাই
হচ্ছো সর্বোত্তম উম্মত, মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের অভ্যুত্থান হয়েছে, তোমরা
সৎ কাজে নির্দেশ দান কর ও অন্যায় কাজে বাধা দাও এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আন।” (দেখুন সূরা আল-ইমরান, আয়াত- ১১০)
আল কুরআনের আলোকে কারা, কী তাবলীগ করবে:
পাক কালামের নির্দেশ মোতাবেক এবং রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) এর নীতি অনুসারে যারা কুরআন ও হাদীসে পারদর্শী তারাই তাবলীগ করবে। মূর্খ ব্যক্তি
তাবলীগ করতে পারবে না। আল্লাহ বলেন, "তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক হোক যারা কল্যাণের
দিকে আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে; এরাই সফলকাম"
(সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১০৪)। উল্লেখিত আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, তাবলীগ বা ইসলাম
প্রচারের জন্য একটি সুসংগঠিত দল, সংঘ, সমিতি বা প্রতিষ্ঠান উন্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যে
অবশ্যই থাকতে হবে; আর এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হবে তিন প্রকার : (১) প্রথমতঃ এর কাজ
হবে মানুষের কল্যাণ, মুক্তি ও নাজাতের পথে আহ্বান জানানো; (২) দ্বিতীয়তঃ এই দল মানুষকে
সৎ কাজের নির্দেশ দিবে; (৩) তৃতীয়ত: সর্ব প্রকার অসৎ কাজে নিষেধ করবে, বাধা দিবে, প্রয়োজনে
তা প্রতিহত করবে (আল হাদীস)। কুরআনের ভাষায় বলতে হয়, এ আহ্বান হবে হেকমতের সাথে, কৌশলের
সাথে, আকর্ষণীয় ভাষায় (কুরআন ১৬ : ১২৫) কিংবা বক্তব্য হবে আল কুরআনের ভিত্তিতে যা সূরা
মায়েদায় ও সূরা কাফ থেকে পূবেই উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সৎ কাজের নির্দেশ ও অসৎ
কাজের নিষেধ করতে হবে; কিন্তু এটা করতে গেলে প্রথমে সৎ ও অসৎ কাজ কী কী তা আমাদের জানতে
হবে।
কোন্ কাজ সৎ আর কোন্ কাজ অসৎঃ
আল কুরআন ও সহীহ হাদীসে যে সমস্ত কার্য
সৎ ও অসৎ বলে ঘোষিত হয়েছে সেটাই আমাদেরকে মেনে নিতে হবে। আমরা ইতোপূর্বে সূরা হাশরের
৭ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছি, "রাসূল (সাঃ) যা নির্দেশ দেন তাই গ্রহণ কর
এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন কর। পুনশ্চ বলা হয়েছে, "তোমাদেরকে প্রতিপালকের
নিকট হতে তোমাদের নিকট যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তোমরা তারই অনুসরণ কর এবং তাঁকে ছাড়া অন্য
কোন অভিভাবকের অনুসরণ করিও না, তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর।" (সূরা আ'রাফ-৩)
আমরা আরও জানি যে, আল্লাহ পাক আমাদের
জন্য ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে প্রদান করেছেন। তাঁর সকল রহমত দ্বারা
ইসলামরূপ জীবন ব্যবস্থাকে পূর্ণতা প্রদান করেছেন, কিছু অবশিষ্ট রাখেননি। (সূরা মায়েদা-৩)
আনুগত্য করতে হবে কার? উলুল আমর প্রসঙ্গ:
আল কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, "হে মুমিনগণ
তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত"।
কোন বিষয়ে তোমাদের মতভেদ ঘটলে সেই বিষয়টাকে প্রত্যাবর্তিত করবে আল্লাহর পানে ও রাসূলের
পানে" (সূরা নেছা-৫৯)। এই আয়াতের উল্লেখ করে উলুল আমর এর অর্থ
|
করতে গিয়ে কেউ কেউ বুজুর্গ, জামাতের
আমীর ও ধর্মীয় নেতার, এমনকি সুফীদের কথাও বলে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে উলুল আমর
বলতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিকেই বুঝায়। যেমন খোলাফায়ে রাশেদীন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও
তাঁর নির্দেশ বা ফয়সালা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফয়সালার পরিপন্থী হয় তাহলে আল্লাহ
ও তাঁর রাসুলের পানেই ফিরে আসতে হবে। দেখুন সূরা নেছার আয়াত নং ৫৯, সূরা আহযাব আয়াত
নং ৩৬। সহীহ হাদীস ও বিশ্বস্ত ইতিহাসে এর যথেষ্টে বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। স্বয়ং প্রথম
খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পরই যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা থেকেই এটা
প্রমাণিত হয়। তিনি ভাষণে বলে, "As I obey Allah and his Prophet, obey me, if
I neglect the laws of Allah and the Prophet, I have no more right to your
obedience" (A Short History of the Saracens, Page no. 22) "যতক্ষণ পর্যন্ত
আমি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের নির্দেশ মেনে চলি ততক্ষণ পর্যন্তই তোমরা আমাকে মেনে চলবে।
আর যদি আমি আল্লাহ এবং রাসূলের বিধান অমান্য করি তাহলে তোমাদের আনুগত্যের উপর আমার
আর কোন অধিকার থাকবে না"।
উলুল আমর:
যারা ন্যায়সঙ্গতভাবে শাসন ক্ষমতার
অধিকার প্রাপ্ত তাদেরকেই উলুল আমর বলা হয়ে থাকে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত
কুরআনের তরজমায় তার অর্থ করা হয়েছে, "যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত"। (পৃঃ ১৬৩)
মাওলানা আকরাম খাঁ তাঁর তাফসীরের ২য়
খন্ডের ১৩ পৃষ্ঠায় এর অর্থ করেছেন " তোমাদের মধ্যকার শাসন অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিগণ"।
মাওলানা মুফতী শাফী সাহেবের বঙ্গানুবাদ তাফসীরের ২৭৫ পৃষ্ঠায় এর অনুবাদ করা হয়েছে,
"তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের"। আল্লামা ইউসুফ আলীর ইংরেজী তফসীরের ১৯৮
পৃষ্ঠায় এর অনুবাদ করা হয়েছে, "Those charged with authority among
you". মুহাম্মদ মারমাডিউক পিকথল তার তরজমার ৮৫ পৃষ্ঠায় এর অর্থ করেছেন, Those
of you who are in authority. (The Meaning of the glorious koran)
উপমহাদেশের সর্বজন স্বীকৃত শ্রেষ্ঠ
আলেমগণ যারা উলুল আমরের অর্থ করেছেন, শাসন ক্ষমতার অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তি বলে, তারা
হচ্ছেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী, শাহ রফী উদ্দীন, শাহ আবদুল কাদের, মাওলানা সানাউল্লাহ
অমৃতসরী, মাওলানা হক্কানী, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী প্রমুখ।
মাওলানা আকরাম খাঁ তাঁর তাফসীরের ২য়
খন্ডের ২১ পৃষ্ঠায় লিখেন, "উলুল আমর" শব্দের শাব্দিক অনুবাদ "হুকুমের
মালেকগণ।" আনুষঙ্গিক সমস্ত আয়াতের মূল শিক্ষার প্রতি লক্ষ্য রেখে, আমি তার অনুবাদ
করেছি "শাসন অধিকার প্রাপ্তগণ" বলে। জালেম রাজা-বাদশাদের জবরদস্তীর আধিপত্য,
তার অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলতঃ তার অর্থ হচ্ছে বৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত শাসনকর্তাগণ। "শাসনকর্তাগণ"ই
যে তার অর্থ, তা দেখবার জন্য আমাদের দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট আলেমের অনুবাদ নিম্নে উদ্ধৃত
করলাম।
|

এই সব অনুবাদের প্রত্যেকটিতে উলুল
আমর শব্দের অর্থ করা হয়েছে "শাসনকর্তা" বা "শাসন ক্ষমতাপ্রাপ্ত"
ব্যক্তিগণ বলে। এটাই আয়াতের যথার্থ তাৎপর্য।
ন্যায় সঙ্গতভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত
ব্যক্তি ছাড়াও তিনি যাকে বা যাদেরকে বিশেষ দায়িত্ব পালন করার জন্য নিয়োগ করেন, যেমন
প্রাদেশিক শাসক কর্তা, জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন শাসকর্তা, সেনা প্রধান, বিচারক, খাজনা
বা টেক্স আদায়কারী বা অন্য কোন ব্যাপারে খলীফা বা আমীরুল মুমিনীন কর্তৃক নিয়োজিত ব্যক্তিকেও
উলুল আমর বলা যাবে। কিন্তু একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার, আর তা হচ্ছে এই যে, যিনি বা
যারা দায়িত্ব প্রাপ্ত,
|
তিনি বা তাদেরকে সর্ব ব্যাপারে অবশ্যই
আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ মতই কাজ করতে হবে। অবশ্য উদ্ভুত পরিস্থিতির মোকাবেলা
বা সমস্যার সমাধানে যদি আল্লাহ বা তদীয় রাসূলের (সাঃ) কোন নির্দেশ পাওয়া না যায় তাহলে
কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।
এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সাঃ) হযরত মুয়াজ
ইবনে যাবালকে গভর্ণর করে ইয়ামেনে পাঠানোর সময় হযরত মুয়াজ যা বলেছিলেন তা বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, "আমি সর্ব ব্যাপারে মহান আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের
(সাঃ) নির্দেশ অনুসরণ করে চলবো। তবে উদ্ভুত সমস্যার সমাধানে যদি কুরআন ও সুন্নাহর কোন
নির্দেশ বা দিক নির্দেশনা পাওয়া না যায় তা হলে কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শের ভিত্তিতে ইজতিহাদের
আলোকে সমস্যার সমাধান করবো। এই জবাব পেয়ে নবী করিম (সাঃ) খুশী হলেন এবং মুয়াজর নীতি
অনুমোদন করলেন।
কোন ব্যাপারেই আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের
(সাঃ) নির্দেশের বিপরীত কিছুই করা যাবে না এবং তা করলে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যেতে হবে।
এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনের ৩টি আয়াতের
উল্লেখ করছি:
১। "কিন্তু! না, তোমার প্রতিপালকের
শপথ। তাহারা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের বিবাদ বিসম্বাদের বিচার
ভার তোমার উপর (রাসূলের উপর) অর্পণ না করে; অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাহাদের
মনে দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়। (সূরা আন-নিসা-৬৫)
২। "আল্লার ও তাঁর রাসুল কোন
বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন বিশ্বাসী পুরুষ বা কোন বিশ্বাসী নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন বিশ্বাসের
অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তদীয় রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।
(সূরা আল-আহযাব-৬৫)
৩। "বল, আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত
হও। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় (প্রত্যাখ্যান করে) তবে জেনে রাখ আল্লাহ সত্য প্রত্যাখ্যানকারীগণকে
(কাফেরগণকে) ভালবাসেন না"। (সূরা আলু ইমরান-৩২)
উল্লেখিত আয়াত ৩টির বিস্তারিত তাফসীর
দেখার জন্য সম্মানিত পাঠক পাঠিকাদের নিকট অনুরোধ রইল। পুস্তিকার কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায়
তাফসীরের আলোচনা করতে না পারায় আমরা দুঃখিত।
এই প্রসঙ্গে মুসলিম জাহানের সর্বত্র
সমাদৃত প্রসিদ্ধ তাফসীর ইবনে কাসীরে আলোচিত দু'টি উদাহরণ পেশ করছি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক
প্রকাশিত তাফসীরে ইবনে কাসীরের বাংলা অনুবাদের তৃতীয় খণ্ডের ১২২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে
যে, রাসূলে করীম (সাঃ) জনৈক আনসার সাহাবীর নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে পাঠালেন।
এক সময়ে উক্ত আনসার কোন কারণে স্বীয় বাহিনীর লোকজনের উপর রাগান্বিত হয়ে তাদেরকে বললেন,
আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কি আমার আনুগত্য করতে তোমাদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন নাই?
তারা বলল, হাঁ। তিনি বললেন, তবে তোমরা আমাকে জ্বালানী সংগ্রহ করে দাও। তারা জ্বালানী
এনে দিলে তিনি তাতে আগুন
|
ধরিয়ে দিয়ে সকলকে বললেন, "আমি
তোমাদেরকে তাতে প্রবেশ করতে নির্দেশ দিচ্ছি।" তাদের মধ্যকার জনৈক যুবক সকলকে উল্লেখ
করে বললেন, "তোমরা আগুন হতে বাঁচার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট পালিয়ে এসেছ।
অতএব তাঁর সহিত সাক্ষাৎ না করে তাতে প্রবেশ করো না। তিনি তোমাদেরকে তাতে প্রবেশ করতে
নির্দেশ দিলে তোমরা প্রবেশ করো। সে মতে তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট ফিরে গিয়ে তাঁর
নিকট উপরোক্ত ঘটনা খুলে বলল। তিনি বললেন, "তোমরা তাতে প্রবেশ করলে তা হতে কখনো
বের হতে পারতে না। শুধু ন্যায় কার্যের বিষয়েই আমীরের প্রতি অনুগত থাকতে হয়"।
"ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উপরোল্লিখিত
রাবী আ'মাশ হতে উপরোক্ত উর্দ্ধতন সনদাংশ এবং অন্যরূপ অধঃস্তন সনদাংশে উপরোক্ত হাদীস
অবিচ্ছিন্ন সনদের হাদীস হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন।"
"আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) হতে
ধারাবাহিকভাবে নাফে, উবায়দুল্লা ইয়াহিয়া, মুসাদ্দাদ ও ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন
যে, মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "মুসলিম ব্যক্তির প্রতি তাঁর নেতার পক্ষ হতে যে নির্দেশ
প্রদত্ত হয় তা তার পছন্দ হোক আর না হোক, যতক্ষণ না অন্যায়ের নির্দেশ প্রদান করা হয়,
ততক্ষণ তা পালন করা তার অপরিহার্য দায়িত্ব। তবে কোনরূপ অন্যায় বিষয়ে আদিষ্ট হলে সে
যেন তা পালন না করে"। (ইবনে কাসীর, পৃঃ ১২৩)
"ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমও
উপরোল্লিখিত রাবী ইয়াহিয়া আল কাত্তান হতে উপরোক্ত উর্দ্ধতন সনদাংশে এবং অন্যরূপ অধঃস্তন
সনদাংশে উপরোক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন"।
"রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আল্লাহর
তরফ হতে আগত কোন প্রমাণ মোতাবেক তোমরা স্পষ্ট কুফর দেখতে পেলে তার (আমীরের) নির্দেশ
মানবে না"।
(তাফসীরে ইবনে কাসীরের বঙ্গানুবাদ, পৃঃ-১২৩)
দ্বিতীয় উদাহরণটিও ইবনে কাসীরের বর্ণনা
থেকে উপস্থাপিত করছি। "একদা হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) হযরত খালিদের নেতৃত্বে একটি
সেনাবাহিনী যুদ্ধে পাঠালেন। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসারও উক্ত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
উক্ত বাহিনী উদ্দিষ্ট গোত্রের আবাস ভূমি হতে নিকটবর্তী এক স্থানে গিয়া রাত্রি যাপনের
জন্য শিবির স্থাপন করলেন। সংশ্লিষ্ট গোত্রের লোকজন গোয়েন্দার মাধ্যমে উক্ত সংবাদ অবগত
হয়ে সেই রাত্রেই পালিয়ে গেল। মাত্র একটি লোক পালালো না। লোকটি রাত্রির অন্ধকারে মুসলিম
বাহিনীর নিকট আগমন করে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ) এর নিকট গমন করলেন। তাঁকে বললেন,
"ওহে ইবনে ইয়াসার। নিশ্চয় আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, আর সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আল্লাহ
ভিন্ন অন্য কোন মাবুদ নাই এবং মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমার লোকেরা তোমাদের
আগমনের সংবাদ জানতে পেরে পালিয়ে গেছে। কিন্তু আমি রয়ে গেছি। আগামীকাল আমার ইসলাম গ্রহণ
কি আমার উপকারে আসবে, না আমি পালাবো?" হযরত আম্মার (রাঃ) বললেন, "তোমার ইসলাম
গ্রহণ উপকারে আসবে। অতএব পলায়ন করো না' বরং রয়ে যাও।" লোকটা পালালো না। বরং সে
রয়ে গেল। ভোর রাত্রে হযরত খালেদ (রাঃ) স্বীয় বাহিনী নিয়ে সংশ্লিষ্ট গোত্রের এলাকায়
অতর্কিতে আক্রমণ চালালেন। কিন্তু পূর্বোক্ত লোকটিকে ছাড়া সেখানে আর কাউকেও পেলেন না।
তাকে তার ধন সম্পত্তিসহ ধরে আনলেন। হযরত আম্মার (রাঃ) এর কানে এই সংবাদ পৌছিলে তিনি হযরত খালেদ
(রাঃ) এর নিকট উপস্থিত
|
হয়ে বললেন, "লোকটিকে মুক্ত
করে দিন। কারণ সে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং সে আমার আশ্রয়ে আছে"। হযরত খালেদ (রাঃ)
বললেন, কোন অধিকার বলে তুমি আশ্রয় প্রদান করেছ? তাঁরা উভয়ে পরস্পরকে আঘাত দিয়ে বাক্য
বিনিময় করলেন। অবশেষে তাঁরা মহানবী (সাঃ) এর নিকট উক্ত বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। তিনি
হযরত আম্মার (রাঃ) এর আশ্রয় প্রদানকে বলবৎ রাখলেন। তবে আমীরের অনুমতি ব্যতিরেকে
ভবিষ্যতে কাউকে আশ্রয় দিতে তাঁকে নিষেধ করলেন" (তাফসীরে ইবনে কাসীর, বাংলা, পৃঃ
১২৫)
পরিশেষে ইবনে কাসীর সুরা নেসার সংশ্লিষ্ট
আয়াতের (নং ৫৯) ব্যাখ্যার পরিসমাপ্তি টেনে বলেন, "আল্লাহর কিতাব মেনে চলো, তাঁর
রাসূলের সুন্নাহ বা পথ আঁকড়ে ধর এবং নির্দেশের অধিকারী নেতাগণ আল্লাহর আনুগত্যের সহিত
সামঞ্জস্যশীল যে সকল নির্দেশ প্রদান করেন সেই সকল নির্দেশ মেনে চলো। তবে তাঁরা যদি
আল্লাহর অবাধ্যতামূলক নির্দেশ প্রদান করে তবে তা পালন করা যাবে না। কারণ আল্লাহর অবাধ্যতা
করে তার আনুগত্য করা যেতে পারে না। যেমন ইতোপূর্বে উল্লেখিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, শুধু
ন্যায়ের বিষয়েই আনুগত্য করতে হবে।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর, বাংলা, পৃঃ ১২৬)
এই নীতির প্রশ্নে বিশ্ব বরেণ্য ইমাম
আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে
যুবায়ের, ইমাম হুসাইন, ইমান ইবনে তাইমিয়া, মুজাদ্দেদ আলফে সানী, শাহ ওলী উল্লাহ দেহলভী,
সৈয়দ আহমদ বিরলভী, শাহ আল্লামা ইসমাইল শহীদ প্রমুখ নায়েবে রাসূলগণ ছিলেন আপোষহীন। তারা
জালেম খলিফা বা অত্যাচারী বাদশাহ ও শাসকের নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হয়েও কুরআন ও সুন্নাহর
আদর্শ ও নীতি বর্জন করে অন্যায়ের নিকট নতি স্বীকার করেননি। তারা সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও,
এমনকি জীবনের বিনিময়েও সর্ব ব্যাপারে আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের নির্দেশই অনুসরণ করে চলেছেন।
তাবলীগসহ সর্ব ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহ ও তদীয় রাসূলেরই (সাঃ) অনুসরণ করতে
হবেঃ
এতএব এটা কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে
স্বীকৃত যে, তাবলীগসহ সর্ব ব্যাপারে আমাদেরকে অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) নির্দেশ
মতই চলতে হবে। এই বক্তব্যের সমর্থনে অকাট্য দলিল হিসাবে আপনাদেরকে সূরা আনআমের ১৫৩
নাম্বার আয়াতের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি; বলা হচ্ছে, "আরও (নির্দেশ দিচ্ছেন)
যে এটা আমার অবধারিত সুদৃঢ় সরল পথ, অতএব তোমরা একমাত্র তারই অনুসরণ করবে, আর অন্য সব
পথের অনুসরণ করো না; অন্যথায় এগুলি তোমাদেরকে তাঁর পথ হতে বিচ্যুত করে দিবে, এই সব
বিষয়ে আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা সাবধান হও"। এরশাদ হচ্ছে, তোমাদের
প্রতিপালকের নিকট হতে যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে তোমরা তারই অনুসরণ কর; আর তাঁকে
ছাড়া অন্য কোন অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর। (সূরা-৭,
আয়াত-৩)
|
সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ আলোচনা:
তাবলীগ সম্পর্কে আল্লাহ্র নির্দেশ
ও তাঁর রাসূলের অনুসৃত নীতি সম্পর্কে যৎকিঞ্চিত আলোকপাত করলাম। এখন আমরা তাবলীগ জামাতের
নীতি ও তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও তাদের
প্রকাশিত বই থেকে পৃষ্ঠাসহ উদ্ধৃতি দিয়ে সঠিক তথ্য আপনাদের অবগতি ও বিবেচনার জন্য পেশ
করছি।
তাবলীগ জামাতের নীতি:
তারা তাবলীগের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব
নীতি ও তাদের নির্ধারিত কেতাবের বাইরে কিছু করতে প্রস্তুত নয়।
মৌখিক প্রচারের নমুনা:
তাদের আলোচনায় নামাজ, রোজা ও সামগ্রিকভাবে
ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলতের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে একথা ঠিক। কিন্তু ইসলামের মূলমন্ত্র
তাওহীদ এবং তার পরিপন্থী অমার্জনীয় পাপ শির্ক এবং পরিপূর্ণভাবে সুন্নাতের অনুসরণ ও
এটার পরিপন্থী বিদআত যা মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে সে সম্পর্কে তাদের কোন আলোচনা
দেখা যায় না এবং এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁরা কোন বইও প্রকাশ করেননি। ইসলামের মর্মবাণী
তাওহীদ এবং এর পরিপন্থী শির্ক এর উপর কোন আলোচনা করা হয় না। অথচ নাবী (সাঃ) মাক্কী
জীবনে তাঁর নবুওতের দীর্ঘ ১৩ বছর প্রধানতঃ এ বিষয়ের উপরেই তাবলীগ করেছেন। তাদের আলোচনা
বৈঠকে একই পদ্ধতি ও নীতি অনুসরণ করা হয়ে থাকে। ছোট খাট আলোচনা বৈঠক থেকে শুরু করে টঙ্গীর
বিশ্ব এজতেমা পর্যন্ত আমি দেখেছি যে, এ ব্যাপারে এই নীতিই ও পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়ে
থাকে। তাঁরা বলে থাকেন, "মেহনত করতে হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও এডভোকেট হওয়ার
জন্য যেমন মেহনত করতে হয় তেমনি দ্বীনী সফলতা লাভ ও জান্নাত লাভের জন্য মেহনত করতে হবে।
সবাই আসুন, জামাতে শরীক হউন এবং চিল্লায় কে কে যাবেন নাম লিখান। জামাতে বের হলে, চিল্লায়
গমন করলে, এজতেমায় অংশ গ্রহণ করলে লক্ষ লক্ষ গুণ সওয়াব পাওয়া যাবে।"
টঙ্গীর আখেরী মুনাজাতঃ কর্মহীন দোওয়ার ফল নেই
এমনও বলতে শুনা যায় যে, বিশ্ব এজতেমায়
৩ বার উপস্থিত থাকলে এক হজ্জের সমান সওয়াব পাওয়া যাবে। টঙ্গী বিশ্ব এজতেমার আখেরী মুনাজাতে
শরীক হওয়ার উপর এত বেশী গুরুত্ব দেয়া হয় যে, রাজধানীর বিভিন্ন শ্রেণীর অধিকাংশ মুসলমানই
এই আখেরী মুনাজাতে শরীক হয়ে থাকেন। কিন্তু এই আখেরী মুনাজাতে আমরা কী পরিমাণ ফায়দা
পাচ্ছি, না পেয়ে থাকলে কেন পাচ্ছি না, কর্মহীন দোয়ার কোন গুরুত্ব আছে কিনা? রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) কি শুধু দোয়াই করেছেন, নাকি দোয়ার পর পরেই কর্মক্ষেত্রে এবং জিহাদের ময়দানে উপস্থিত
হয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন: এসব বিষয়গুলি গভীরভাবে তলিয়ে দেখার জন্য
সকল মুসলমান ভাই-বোনের নিকট আকুল আবেদন রইলো।
|
চিল্লা পদ্ধতির দলিল কোথায়ঃ
তাঁরা চিল্লায় যাওয়ার জন্য সর্বাধিক
গুরুত্ব দিয়ে থাকেন; অথচ কুরআন ও সহীহ্ হাদীস থেকে আজ পর্যন্ত তাঁরা এর কোন প্রমাণ
দিতে পারেননি। এটা কি নবীর (সাঃ) তরীকা না মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের নবাবিষ্কৃত বিদআতী
তরীকা? এটা ভেবে দেখার জন্য সবাইকে অনুরোধ করছি।
কুরআন হাদীসের আলোচনায় অনীহাঃ
তারা মজলিসে কুরআন হাদীসের আলোচনা
করতে বললে তাঁরা অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁরা বলে থাকেন যে, এটা আলেম উলামাদের কাজ। তাদের
পঠনীয় গ্রন্থ হচ্ছে তাবলীগে নেছাব, ফাজায়েলে আমল, তথা তাদের নির্ধারিত তাবলীগ জামাতের
কেতাবসমূহ। তাদের নিজস্ব কেতাব ছাড়া অন্য কোন ইসলামী কেতাব পড়তে উৎসাহিত করা হয়
না, প্রকারান্তরে নিষেধ করা হয়ে থাকে।
যে সমস্ত মসজিদে তাদের একচেটিয়া অধিকার
আছে সে সব মসজিদে তাদের তাবলীগী কেতাব ছাড়া অন্য কোন কেতাব এমনকি হাদীস ও তাফসীরের
কেতাবও রাখতে দেওয়া হয় না। জামালপুর শহরে বোসপাড়া মসজিদে তাই করা হয়েছে।
আকীদায় শির্ক ও শির্ক কাজে উৎসাহ প্রদানঃ
উল্লেখিত প্রসঙ্গে তাবলীগ জামাত কর্তৃক
প্রকাশিত কেতাব থেকে শির্কের নমুনা নিম্নে উপস্থাপিত করছি।
১। তাবলীগ জামাতের পথ প্রদর্শক মাওলানা
জাকারিয়া সাহেব তাবলীগ জামাতের প্রধান কেতাব ফাজায়েলে আমলের ভূমিকায় প্রথমেই লিখছেন,
"এত বড় বুজুর্গের (মাওলানা ইলিয়াস) সন্তুষ্টি বিধান আমার পরকালের নাজাতের উছিলা
হবে মনে করে আমি উক্ত কাজে (এই কেতাব লিখার কাজ) সচেষ্ট হই"।
ফাজায়েলে হজ্জ (মাওলানা জাকারিয়ার
লেখা) কেতাব থেকে কিছু উদাহরণ পৃষ্ঠাসহ নিম্নে প্রদত্ত হলো।
২। ক্ষুধার্ত এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) এর কবরের পার্শ্বে গিয়ে খাদ্যের আবেদন করে ঘুমিয়ে পড়লেন। সেই অবস্থায় তাঁর নিকট
রুটি আসলো, ঘুমন্ত তাঁর অবস্থায় অর্ধেক রুটি খাওয়ার পর জাগ্রত হয়ে অবশিষ্ট রুটি খেলেন।
(ফাজায়েলে হজ্জ, পৃঃ ১৫৫-১৫৬)
৩। জনৈক মহিলা ৩ জন খাদেম কর্তৃক মার
খাওয়ার পর রাসূলের কবরের পার্শ্বে গিয়ে বিচার প্রার্থনা করলে, আওয়াজ আসলো ধৈর্য ধর,
ফল পাবে। এরপরেই অত্যাচারী খাদেমগণ মারা গেল। (ফাজায়েলে হজ্জ, পৃঃ ১৫৯)
৪। অর্থাভাবে বিপন্ন ব্যক্তি হুজুরের
কবরের পার্শ্বে হাজির হয়ে সাহায্য প্রার্থনা করায় তা মঞ্জুর হলো। লোকটি ঘুম থেকে জাগ্রত
হয়ে দেখতে পেল যে, তার হাতে অনেকগুলি দিরহাম। (ফাজায়েলে হজ্জ, পৃঃ ১৬২-৬৩)
|
৫। মদীনায় মসজিদে আযান দেওয়া অবস্থায়
এক খাদেম মুয়াজ্জেমকে প্রহার করায় হুজুরের (সাঃ) কবরে মুয়াজ্জেম কর্তৃক বিচার প্রার্থনা।
প্রার্থনা মঞ্জুর। ৩ দিন পরেই ঐ খাদেমের মৃত্যু। (ফাজায়েলে হজ্জ, পৃঃ ১৬২-৬৩)
৬। জনৈক অসুস্থ ব্যক্তি চিকিৎসায় ব্যর্থ
হওয়ায় ঐ ব্যক্তির আত্মীয়, 'করডোভার এক মন্ত্রী' আরোগ্যের আরজ করে হুজুরের (সাঃ) কবরে
পাঠ করার জন্য অসুস্থ ব্যক্তিকে পত্রসহ মদীনায় প্রেরণ। কবরের পার্শ্বেই পত্র পাঠ করার
পরেই রোগীর আরোগ্য লাভ। (ফাজায়েলে হজ্জ, পৃঃ ১৬৭)
৭। কোন ব্যক্তি হজুরের (সাঃ) রওজায়
আরজ করায় রওজা হতে হুজুরের (সাঃ) হস্ত মুবারক বের হয়ে আসলে উহা চুম্বন করে সে ধন্য
হলো। নব্বই হাজার লোক উহা দেখতে পেল। মাহবুবে সোবহানী হযরত আবদুল কাদের জিলানীও সেখানে
উপস্থিত ছিলেন। (ফাজায়েলে হজ্জ, পৃঃ ১৫৯)
৮। অনাবৃষ্টির জন্য হযরত ওমরের (রাঃ)
সময় জনৈক ব্যক্তি আল্লাহর শরণাপন্ন না হয়ে হুজুরের (সাঃ) রওজায় গিয়ে হুজুরের (সাঃ)
নিকট বৃষ্টির জন্য আরজ পেশ করলো। আরজ মঞ্জুর। হুজুর (সাঃ) বললেন যে, বৃষ্টি হবে। (ফাজায়েলে
হজ্জ, পৃঃ ১৬১)
৯। হজ্জের সময় জনৈক ব্যক্তির মা মারা
যায়। তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়, পেট অনেক ফুলে যায়। ঐ ব্যক্তি আল্লাহর নিকট কান্নাকাটি
করতে থাকে। হঠাৎ এক খণ্ড মেঘ এসে গেল। মেঘ থেকে এক মহান ব্যক্তি আবির্ভূত হলেন। তিনি
মৃত ব্যক্তির মুখ ও পেটে হাত দিলেন। তখন উহা স্বাভাবিক হয়ে গেল। আগন্তুক ব্যক্তি আর
কেহই নহে, তিনি বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। (ফাজায়েলে দরূদ, পৃঃ ১২৬)
১০। ফাজায়েলে হজ্জ নামক কেতাবের ১৫৩
পৃষ্ঠা হতে ১৭১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এই সমস্ত কাল্পনিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বমোট
এরূপ ৪০ টি কাহিনীর উল্লেখ আছে। আর অধ্যায়টির নাম দেওয়া হয়েছে নবী প্রেমের বিভিন্ন
কাহিনী। কাহিনী মানেই কুরআন হাদীসের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
১১। হযরত ইমাম আবু হানিফা (রাঃ) অজুর
পানির সহিত বিশেষ ব্যক্তির কোন কোন গুনাহ ঝরিয়া যাইত তা স্পষ্ট দেখিতে পাইতেন। (ফাজায়েলে
নামাজ, পৃঃ ২২)
একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেহ গায়েবী
খবর জানে না। এইরূপ আরও অসংখ্য আজগুবি, কাল্পনিক ও বানোয়াট আকর্ষণীয় ঘটনা তাদের কেতাবে
লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। রচনার কলেবর বৃদ্ধি হওয়ার আশঙ্কায় উল্লেখিত সামান্য করেকটি ঘটনার
উল্লেখ করেই শেষ করলাম। সূরা আরাফের আয়াত নং ১৮৮ তে বলা হচ্ছে যে, গায়েবী খবর একমাত্র
আল্লাহই জানেন এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন যে, "আমি নিজে কোন গায়েবী খবর জানি
না। জানলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম। ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনো হতে পারতো না"।
এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে, আপনি বলে দিন, আমি নিজেইতো আমার নিজের কল্যাণ সাধনের ও অকল্যাণ
সাধনের মালিক নই। কিন্তু আল্লাহ্র যা ইচ্ছা (তাই ঘটবে)। এই প্রসঙ্গে "আল্লাহ রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) কে বলেন, হে নবী আপনি বলে দিন যে, গায়েবের খবর একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আসমান জমিনের
মধ্যে আর কারো জানা নেই। (বুখারী, মুসলিম তিরমিযী, নাসাই, তাফহীমুল কুরআন বঙ্গানুবাদ
১০ম খণ্ড পৃঃ ২৫১)।
|
ভ্রান্ত আকীদাসমূহের যতকিঞ্চিত পর্যালোচনাঃ
প্রথমেই ধরা যাক তাবলীগ জামাতে একচ্ছত্র
লেখক ও অনুসরণীয় হাদী মাওলানা জাকারিয়া সাহেবের নাজাতের পথ। তিনি লেখলেন, মাওলানা ইলিয়াস
সাহেবের সন্তুষ্টি বিধান তার পরকালের নাজাতের উছিলা হতে পারে। কোন মানুষের সন্তুষ্টিতে
নাজাতের পথ হতে পারে কুরআন ও সহীহ্ হাদীস থেকে এর কোন প্রমাণ কেউই দেখাতে পারবেন না।
বরং পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, একমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভ
ছাড়া কেউই নাজাত পাবে না, হাদীসেও এর যথেষ্ট প্রমাণ আছে।
জান্নাতী হবেন যারা তাদের সম্পর্কে আল কুরআনঃ
১। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং
তারাও আল্লাহ্র প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্য যে তার প্রতিপালককে ভয় করে। (সূরা বাইয়েনাহ,-৮)
২। সূরা ফাতাহ এর শেষ আয়াতে মুমিনদের
বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে বলা হচ্ছে, "তারা কামনা করছে একমাত্র আল্লাহর
অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি"। (সূরা ফাতহ-২৯)
৩। "কেবল তার মহান প্রতিপালকের
সন্তুষ্টি লাভের জন্য। সে তো সন্তোষ লাভ করবেই। (সূরা আল-লাইল-২০-২১)
৪। সুরা নামলে হযরত সোলায়মানের একটি
দোয়ার উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, "হে পরওয়ারদিগার। আমাকে সামর্থ্য দান কর যাতে তোমার
সন্তুষ্টি লাভকরা যায় এমন কাজ করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমার সৎ কর্মপরায়ণ
বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর" (সূরা নামল-১৯)। এই আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে আল্লামা
মুহাম্মাদ শফী, কুরআনুল করিমের তাফসীরে সংক্ষিপ্তাকারে (বাংলায় লেখা মাওলানা মুহিউদ্দিন
খান, পৃঃ ৯৯১) বলেন, "সৎকর্ম মকবুল হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত জান্নাতের
প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে না।"
আয়াতের শেষ অংশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,
"সৎকর্ম সম্পাদন এবং তা মকবুল হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার কৃপা দ্বারাই (সন্তুষ্টি)
জান্নাতের প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে"। "রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, কোন ব্যক্তি
তার কর্মের উপর ভরসা করে জান্নাতে যাবে না। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আপনিও কি? তিনি বললেন,
হাঁ, আমিও"। কিন্তু আমাকে আল্লাহর অনুগ্রহ বেষ্টন করে আছে। রুহুল 'মা' আনী। হযরত সোলায়মান (আঃ) ঐসব বাক্যে জান্নাতে
প্রবেশ করার জন্য খোদায়ী কৃপা ও অনুগ্রহের জন্য দোয়া করেছেন, অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমাকে
সেই কৃপা দান কর, যা দ্বারা জান্নাতের উপযুক্ত হই।" (ঐ পৃঃ ৯১১ সূরা নামল আয়াত
১৯) মুফতি মাওলানা শফীর তাফসীর)
বিশ্বনবী (সাঃ) ও হযরত সোলায়মান (আঃ)
যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ ছাড়া বেহেমতে প্রবেশ করতে না পারেন তবে মাওলানা জাকায়িরা
সাহেব আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের সন্তুষ্টি লাভ করেই জান্নাতী
হবেন এর দলিল কেউ কোনদিনই দিতে পারবেন না। আমাদের মতে এই আকীদা অবশ্যই শির্ক এবং শির্ক
কোন দিনই মাফ হবে না। এমনকি নবী করিম (সাঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছে, "হে নবী (সাঃ)!
যদি তুমিও শির্ক
|
করে ফেল তাহলে নিশ্চয় তোমার সমস্ত
আমলই বরবাদ হয়ে যাবে এবং তুমিও অবশ্যই ক্ষতি গ্রস্তদের অন্তর্গত হবে। (সুরা যুমার-৬৫)।
তাদের প্রচারিত শির্কের আরও কিছু নমুনা:
মাছনবীয়ে মাওলানা জামীর (রাঃ) কাছিদার
বাংলা অনুবাদ যাহা ফাজায়েলে দরুদের পৃঃ ১২৪ হতে ১৪৫ পর্যন্ত ছাপা হয়েছে, তার কিছু অংশ,
চিন্তাশীল পাঠক পাঠিকাগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য উপস্থপিত করা হলো।
১। "হে আল্লাহর পেয়ারা নবী (সাঃ)!
মেহেরবানী পূর্বক আপনি একটু দয়া ও রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন।” (পৃঃ ১৪২)
২। "আপনি সারা বিশ্বের জন্য রহমত
স্বরূপ; কাজেই আমাদের মত দুর্ভাগা হতে আপনি কী করে গাফেল থাকতে পারেন।” (পৃঃ ১৪২)
৩। "আপন সৌন্দর্য ও সৌরবের সারা
জাহানকে সঞ্জীবিত করিয়া তুলুন এবং ঘুমন্ত নারগিছ ফুলের মত জাগ্রত হইয়া সারা বিশ্বাবাসীকে
উদ্ভাসিত করুন।"
৪। "আমাদের চিন্তাযুক্ত রাত্রিসমূহকে
আপনি দিন বানাইয়া দিন এবং আপনার বিশ্বসুন্দর চেহারার ঝলকে আমাদের দ্বীনকে কামিয়াব করিয়া
দিন। ব্ব
(পৃঃ ১৪৩)
৫। "দুর্বল ও অসহায়দের সাহায্য
করুন আর খাঁটি প্রেমিকদের অন্তরে সান্ত্বনা দান করুন।" (পৃঃ ১৪৩)
৬। "আমি, আপন অহংকারী নাফছে আম্মারার
ধোকায় ভীষণ দুর্বল হইয়া পড়িয়াছি। এমন অসহায় দুর্বলের প্রতি করুণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন।"
(পৃঃ ১৪৪)
৭। "যদি আপনার করুণার দৃষ্টি
আমার সাহায্যকারী না হয় তবে আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বেকার ও অবশ হইয়া পড়িবে"। (পৃষ্ঠা
১৪৪)
উল্লিখিত আকীদার কাছীদাসমূহে কুরআন
ও সহীহ্ হাদীসের আলোকে নিঃসন্দেহে শির্কি আকীদায় ভরপুর। শাশ্বত-চিরঞ্জীব আল্লাহর পরিবর্তে
কবরে শায়িত রাসুলুল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া যদি শির্ক না হয় হবে আর কিসে শির্ক হবে?
শির্ক প্রসঙ্গে হাদীসঃ
১। হযরত জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) বলেছেন, "যে আল্লাহ্র সাথে কোন কিছুকে শরীক করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো
সে জাহান্নামে প্রবেশ করলো"। (মিশকাত শরীফ ১ম খণ্ড পৃঃ ১৫, মুসলিম শরীফ)
|
২। হযরত মুআয (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) বলেছেন, "তুমি কোন কিছুকেই আল্লাহ্র সাথে শরীক করো না, যদিও তোমাকে হত্যা
করা হয়, অথবা অগ্নিতে দগ্ধীভূত করা হয়"। (মিশকাত শরীফ ১ম খন্ড পৃঃ ১৮)
শির্কের বিস্তার লাভঃ
পূর্বে
উল্লিখিত ঘটনাসমূহে দেখা যাচ্ছে যে, বিপদগ্রস্ত কিছু মানুষ কবরে শায়িত নবী করিম (সাঃ)
এর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করায় তিনি কবর থেকে সাহায্য প্রেরণ করলেন এবং তাদের আবেদনে
সাড়া দিলেন, অপরাধীদের মৃত্যু হলো, আবেদন করায় তার পবিত্র হস্ত বের হয়ে আসলো, তা চুম্বন
করা হলো, এসব ঘটনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। এই সব আকীদা পোষণ করাও শির্ক।
এটা ইসলামের মূলমন্ত্র তাওহীদ ও কালেমায়ে তাইয়েবার পরিপন্থী। এই কালেমায় বলা হয়েছে,
আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেই ইলাহ মনে করে এর স্থান দিলেই
সেটা আল্লাহর সাথে শরীক করা হচ্ছে এবং এই শরীক করাকেই শির্ক বলে। বিষয়টি আরও পরিষ্কার
করে বলার জন্য ইলাহ সম্পর্কে সামান্য আলোচনার প্রয়োজন।
ইলাহ এর পরিচিতিঃ
উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আলেম, শীর্ষস্থানীয়
ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আব্দুল্লাহিল কাফী তাঁর রচিত কালেমায়ে তাইয়েবা কেতাবে ৩ পৃষ্ঠায়
লেখেন, "ইলাহ" শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে উপাস্য, অর্চনার যোগ্য, মুক্তিদাতা,
সাহায্যকারী, পাপ মোচনকারী, উদ্ধার কর্তা, ত্রাণ কর্তা, নিরাপত্তা দানকারী ও প্রিয়তম।
যেরূপ শিশু জননীর জন্য সমুৎসুক ও ব্যাকুল হয়ে থাকে, সেই রূপ মানুষ স্বীয় প্রয়োজনে যাহার
সাহায্যের নিমিত্ত আকুল এবং অনুগ্রহ ও আশ্রয়ের জন্য যার দিকে ধাবিত ও বিপদে যাহার দিকে
অগ্রসর হয় তাহাকেই ইলাহ বলে। (লিসানুল আরব: (১৭) ৩৬০ পৃঃ, Lane's Lexicon (১) ৮৩ পৃঃ।
যিনি ইলাহ তিনিই আল্লাহ। ইলাহ আল্লাহর গুণবাচক নামের মধ্যে একটি। ইলাহ শব্দের যে সমস্ত
অর্থ লিখা হলো তা পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মাওলানা কাফী
এই প্রসঙ্গে আল্লাহ্র সেফাত বর্ণনা করে পবিত্র কুরআন থেকে 'ঐ' কেতাবে দুই শত আয়াত উল্লেখ
করেছেন।
শির্ক কাকে বলেঃ
আল্লাহ সে সমস্ত ক্ষমতা ও গুণের অধিকারী
তা অন্য কোন ব্যক্তি বা দেব দেবী অথবা প্রাকৃতিক বস্তুর মধ্যেও আছে মনে করে আল্লাহর
পরিবর্তে তার উপাসনা করা বা তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করাই হচ্ছে আল্লাহর সাথে শরীক
করা, আর এটাই হচ্ছে অমার্জনীয় মহাপাপ, শির্ক।
আল্লাহ কর্তৃক শির্ক পরিত্যাগ করার নির্দেশঃ
আল্লাহ পাক বলেন,
১। "আল্লাহর সাথে আর কাউকেও ইলাহ
রূপে গ্রহণ করো না, করলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে"। (সূরা বনী ইসরাইল-২২)
|
২। "অতএব তুমি আল্লাহর সহিত অন্য
কোন ইলাহকে ডাকিও না অন্যথায় হয়ে যাবে শাস্তি প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আশ শুয়ারা-২১৩)
৩। "আর আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদেরকে
ডেকে থাক তোমরা, তারা তোমাদেরকে কোন সাহায্য করতে পারবে না এবং তারা নিজেদেরকেও সাহায্য
করতে পারবে না। (সূরা আল আরাফ-১৯৭)
শির্ক ও তার পরিণতিঃ
১। "আল্লাহর সাথে কোন শরীক করো
না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা গুরুতর অপরাধ"। (সূরা লুকমান-১৩)
২। "নিশ্চয় অন্য কিছুকে আল্লাহর
শরীক রূপে গ্রহণ করার যে পাপ আল্লাহ তা মাফ করেন না এবং তা ব্যতীত অন্য সব কিছু যাকে
ইচ্ছা মাফ করেন এবং অন্য কিছুকে আল্লাহর সাথে শরীক করে যে ব্যক্তি সে তো পথ হারিয়ে
বিভ্রান্ত হয়ে গেল বহুদূর দূরান্তরে"। (সূরা আন নেছা-১১৬)
৩। "নিশ্চয় অবস্থা এই যে, আল্লাহর
সাথে শরীক করলো যে ব্যক্তি, বেহেস্তকে আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন তার জন্য এবং জাহান্নামই
হচ্ছে তার শেষ আশ্রম।" (সূরা মায়েদা-৭২)
আমরা উল্লিখিত পাক কুরআনের আলোচনা
হতে এটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কবরে বা অন্য কারো (মৃত ব্যক্তির
নিকটে) সাহায্য চাওয়া, তার শরণাপন্ন হওয়া অমার্জনীয় শির্ক। শির্ক এমনই অমার্জনীয় পাপ
যা নবী (সাঃ) স্বয়ং করলে তাঁকেও ক্ষমা করা হবে না।
৪। এরশাদ হচ্ছে, "তুমি যদি আর
কাউকে আল্লাহর শরীক কর তাহলে তোমার সমস্ত আমল নিশ্চয়ই পণ্ড হয়ে যাবে এবং সে অবস্থায়
তুমি অবশ্যই সর্বনাশ গ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে"। (সূরা আয-যুমার-৬৫)
আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে এই মহা পাপ
শির্ক থেকে রক্ষা করেন। আমীন! শির্ক সম্পর্কে অতি সংক্ষিপ্ত আলোচনা এখানেই শেষ করলাম।
তাবলীগ জামাতে বিদআত ও গুমরাহীর অনুপ্রবেশঃ
অন্ধ অনুকরণের নীতির ফলে বহু বিদআত
ও গুমরাহী আমাদের সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে এবং এভাবেই তাবলীগ জামাতের মধ্যেও এটা প্রকাশ
পাচ্ছে। তাদের লিখিত কেতাব থেকেই আমরা ইনশাআল্লাহ এটা প্রমাণ করবো। প্রথমেই দেখা যাক
বিদআত কাকে বলে। মাসনুন খুৎবা সম্পর্কে আমরা জানি যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রায় সব খুৎবাতেই
বলতেন, "অতঃপর উত্তম হাদীস আল্লাহর কিতাব, উত্তম হিদায়াত হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)
এর হিদায়াত এবং সর্ব নিকৃষ্ট কাজ ধর্মে নতুনত্বের প্রবর্তন এবং ধর্মে প্রত্যেক নতুন
কাজই বিদআত ও প্রতিটি বিদআতই গুমরাহী এবং প্রত্যেক গুমরাহীর পরিণামই জাহান্নাম"।
(হাদীস আবু দাউদ, মুসলিম)
|
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে, প্রত্যেক
বিদআতের কথা। কাজেই বিদআতকে হাসানা ও সাইয়া বলে ভাগ করার কোন সুযোগ নেই।
তাবলীগ জামাতে বিদআতের নমুনা:
তাবলীগ জামাতের হাদী মাওলানা জাকারিয়া
সাহেব কর্তৃক লিখিত ফাজায়েলে নামাজের যথাক্রমে ৭৬, ৯০, ৯৬, ৯৭, ১২৫ পৃষ্ঠায় লেখার সংক্ষিপ্ত
সার উপস্থাপিত করছি।
১। কৃষকগণ মাঠে জামাতে নামাজ আদায়
করলে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব পাওয়া যাবে। (পৃঃ ৭৬)
২। সাবেত নামক এক ব্যক্তি পঞ্চাশ বছর
ঘুমায় নাই, এর বরকতে তিনি কবরে নামাজ পরার সুযোগ পেয়েছিলেন। (পৃঃ ৯৭)
৩। এক অজুতে ইমাম আবু হানিফা এবং আরও
কিছু বুজুর্গ ব্যক্তি পঞ্চাশ বছর এশা ও ফজরের নামাজ পড়তেন। (পৃঃ ৯০)
৪। সুফী আব্দুল ওয়াহেদ প্রতিজ্ঞা করেন
যে, তিনি ঘুমাবেন না এবং সেই ভাবেই জীবন কাটাবেন। (পৃঃ ৯০)
৫। তাকবীরে উলা অর্থাৎ প্রথম তাকবীরে
নামাজে শরীক হওয়া দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে সবচেয়ে উত্তম। অন্য রেওয়াতে আছে আল্লাহর
বাস্তায় এক হাজার উট সদকা করার চেয়েও উত্তম। (পৃঃ ১২৫)
৬। আবু এতাব ছুলামী চল্লিশ বৎসর যাবৎ
দিনের বেলা রোজা রাখতেন। (পৃঃ ৯৭)
৭। হযরত জয়নুল আবেদীন (রাঃ) দৈনিক
এক হাজার রাকাত নামাজ পড়তেন। বাড়ী বা সফরে কোন অবস্থায় তার ব্যতিক্রম হতো না। (পৃঃ
১১৭)
৮। মাওলানা জাকারিয়া সাহেবের লেখা
কেতাব হেকায়েতে সহাবার ২৫৪ ও ২৫৫ পৃষ্ঠায় কোন হাদীস বা বিশ্বস্ত কেতাবের উল্লেখ ছাড়াই
বলা হচ্ছে যে, দুই সাহাবা কর্তৃক রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর রক্ত চুষিয়া পান করার সংবাদ
শুনিয়া হুজুর (সাঃ) বললেন যে, যার শরীরে তাঁর রক্ত ঢুকেছে তাকে দোজখের আগুনে স্পর্শ
করবে না। অথচ আল-কুরআনের সূরা নাহলে ১১৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রক্ত পান করাকে হারাম
বলে ঘোষণা করেছেন। বলা হয়েছে, ইন্নামা হাররামা আলাইকুমুল মাইতাতা ওয়াদদামা।"
৯। এক হাজার রাকাত নামাজে প্রত্যেক
রাকাতে এক হাজার বার সুরা এখলাস পড়লে সোজা বেহেশত লাভ:
মাওলানা জাকারিয়া সাহেব তাঁর কেতাব
ফাজায়েলে দরূদ শরীফের ১০৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, জনৈক ব্যক্তিকে এক বেহেশতী স্বপ্নে দেখান
যে, বেহেশতে যাওয়ার সোজা পথ হচ্ছে এক হাজার রাকাত নফল নামাজের প্রত্যেক রাকাতে এক হাজার
বার কুলহু আল্লাহু আহাদ সূরা (সুরা এখলাস) পড়া।
|
এক হাজার রাকাত নামাজের প্রত্যেক রাকাতেই
এক হাজার বার করে সুবা এখলাস পড়লে রুকু-সেজদাসহ প্রতি রাকাতে কত মিনিট করে সময় লাগবে
সেটা কি মাওলানা জাকারিয়া সাহেব হিসাব করে দেখেছেন? সূরা এখলাস ছাড়া এক রাকাত নামাজ
পড়তে সময় লাগবে কম পক্ষে দুই মিনিট এবং এই হিসাবে এক হাজার রাকাত নামাজ পড়তে সময় লাগবে
৩৩ ঘণ্টা ২০ মিনিট অর্থাৎ একদিন, নয় ঘন্টা বিশ মিনিট। এর পর প্রতি রাকাতে সুরা এখলাস
পড়তে ন্যূনপক্ষে আরও ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় লাগবে অবশ্যই। অতএব প্রতি রাকাতে সময় লাগবে
অন্ততঃ ১২ মিনিট।
এই ১২ মিনিটের মধ্যে যদি ২ মিনিট বাদ
দেওয়া হয় তাহলে প্রতি রাকাতে সময় লাগবে অন্ততঃ ১০ মিনিট এবং এক হাজার রাকাতে সময় লাগবে
সর্বমোট দশ হাজার মিনিট অর্থাৎ ১৬৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বা ৬ দিন, ২২ ঘন্টা, ৪০ মিনিট।
মাওলানা জাকারিয়া সাহেবের ফর্মুলা
অনুযায়ী যদি কোন ব্যক্তি এইভাবে বেহেশত লাভের আশায় একটানা প্রায় ৭ দিন এই নফল নামাজে
নিয়োজিত থাকেন তাহলে সেই ব্যক্তি ঐ ৭ দিনের ৩৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়বেন কখন?
মাওলানা জাকারিয়া সাহেবের অন্ধ অনুসারীগণ
এর জবাব দিবেন কি? এই সময়ে এক হাজার রাকাত নামাজে নিয়োজিত ব্যক্তি তার আহার-নিদ্রা
ও ওয়াক্তিয়া নামাজ বাদ দিয়ে কীভাবে এই হাজার রাকাত নামাজ পড়বেন? তাবলীগ জামাতের ভাইয়েরা
কি এই হাজার রাকাত নামাজ পড়ার পক্ষে কুরআন হাদীস, ফেকাহ, এমনকি কোন সাহাবী, তাবেইন,
তাবে তাবেইন অথবা অনুসরণীয় কোন ইমামের উদ্ধৃতি দেখাতে পারবেন?
তাঁরা এই প্রশ্নের কোন উত্তর কেয়ামত
পর্যন্তও দেখাতে সক্ষম হবেন না। তাহলে তাঁরা ইসলামী বিধান বহির্ভূত এই ধরনের ভিত্তিহীন,
আজগুবী, কপোলকল্পিত ও নবাবিষ্কৃত তথাকথিত মহাপুণ্যের কাজের প্রচার প্রপাগাণ্ডায় লিপ্ত
কেন?
মুসলমানগণকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী
করা ছাড়া এর আর কোন ফল হবে না। আর এটা একটি মারাত্মক বিদআত কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। সহীহ হাদীস অনুযায়ী প্রত্যেক বিদআতী
কাজের পরিণাম ফল হবে জাহান্নাম। আল্লাহ পাক যেন আমাদেরকে এই সমস্ত বিদআতী কাজ থেকে
বিরত থাকার তওফিক দান করে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেন। আমীন।
১০। সারা রাত নামাজ পড়া ও সারা বছর
রোজা রাখা প্রসঙ্গেঃ
হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিন ব্যক্তি
পরস্পর পরস্পরের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল। তাদের মধ্যে একজন বললো, "আমি সর্বদায়
দিনের বেলায় রোজা রেখে যাব, কখনো রোযা ভঙ্গ করবো না", অন্যজন বললো, "আমি
সারা বাত নামাজ পড়বো", অপর জন বললো, "আমি মেয়েদের সংস্পর্শ থেকে সর্বদা দূরে
থাকবো এবং কখনো বিয়ে করবো না"। অতঃপর সেই মুহূর্তে নবী (সাঃ) এসে বললেন, তোমরা
কি সেই সকল লোক যারা এরূপ বলাবলি করছিলে? আল্লাহর শপথ আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশী
ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে অধিক তাব-ওয়ার অধিকারী। আমি রোযা রাখি আবার রোযা ছেড়েও দেই,
আমি নামাজও পড়ি আবার ঘুমাইও, আমি বিবাহ সাদীও করি। অতএব জেনে রাখ, "যে আমার সুন্নাত
থেকে দূরে থাকবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়"-(বুখারী, মুসলিম, মেশকাত শরীফ,
মূল আরবী পৃঃ ২৭)।
|
অতএব, এই বিশ্বস্ত হাদীস থেকে পরিষ্কার
বুঝা গেল যে, এই ধরনের বৈরাগ্যের স্থান ইসলামে নেই। এটা সম্পূর্ণরূপে বিদআত ও গুমরাহী।
যারা এরূপ করবে তারা রাসূলের উম্মতের কেউ নয়, অর্থাৎ তারা মুসলমানই নয়।
হুজুর (সাঃ) এর মল-মূত্র, রক্ত সব কিছুই পাক পবিত্রঃ
১১। হেকায়াতে ছাহাবা কেতাবের ২৫৪ পৃষ্ঠায়,
হাদীসের বা অন্য কোন কেতাবের উল্লেখ ছাড়াই বলা হয়েছে, "হুজুরে পাক (সাঃ) এর মলমূত্র,
রক্ত সব কিছুই পাক পবিত্র। কাজেই তাতে তর্কের অবকাশ নাই।" কিন্তু সকল মুসলমানই
জানে যে, মলমূত্র অপবিত্র। হুজুরের সব কিছুই যদি পবিত্র হয় তবে তিনি পায়খানা প্রস্রাবের
পর নামাজের জন্য অযু করতেন কেন? কাপড়ে বা শরীরে নাজাসাত লাগলে তা ধৌত করতেন কেন?
১২। হাদীস বা কোন কেতাবের উল্লেখ ছাড়াই
হযরত আয়েশার (রাঃ) বরাত দিয়ে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে, কেয়ামতের দিবস
হিসাব নিকাশ শেষ হওয়ার পর আল্লাহ কেরামান কাতেবীনকে বলবেন, অমুক বান্দার একটি নেকির
কথা আমল নামায় লেখনি আর তা হচ্ছে জিকরে খফী- (ফাজায়েলে জিকির, পৃঃ ৬১)। জিকরে খফীর
গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে এক কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে- "প্রেমিক
প্রেমিকার মধ্যে এমন সব রহস্য রয়েছে যা ফেরেশতাগণও জানতে পারে না"। অথচ যারা কুরআন
শরীফ পাঠ করেন তারা সবাই জানেন যে, আল্লাহ পাক সূরা ইনফিতরে বলেছেন, "তারা (কেরামান
কাতেবীন) সবই জানে যা তোমরা কর"- (৮২নং সূরা ইনফিতার- ১২)
১২। হাদীস ও কুরআনের উপর এর চেয়ে বড়
প্রবঞ্চনা আর কী হতে পারে? ৫০ নং সূরা কাফ এর ১৭ ও ১৮ আয়াতে আছে "স্মরণ রাখিও,
দুই ফেরেশতা বসিয়া দক্ষিণে ও বামে বসিয়া তাহার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ
করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তাহাদের নিকট রহিয়াছে। তাবলীগ জামাতের উল্লিখিত
আকীদা কুরআন ও হাদীসের উপর ভয়ানক প্রবঞ্চণা ছাড়া আর কী হতে পারে?
১৩। হাদীস বা কোন কেতাবের উল্লেখ না
করেই ফাজায়েলে জিকির এর ৬৭ পৃষ্ঠায় কোন প্রমাণ ছাড়াই বলা হয়েছে, "ইমাম মালেক হতে
বর্ণিত আছে, ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত কথা বলা মাকরুহ।" কুরআন হাদীস থেকে এর
কোন প্রমাণ নেই।
উদ্দেশ্যমূলক ভুল অনুবাদঃ
১৪। উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে হাদীসের
মিথ্যা অনুবাদ করতে গিয়ে ফাজায়েলে দরূদের ৪৫-৪৬ পৃষ্ঠায় আলাইহিমুস সালাত ওয়াস সালাম
এর অনুবাদ করা হয়েছে, "নবীগণ কবরে জীবিত আছেন এবং তাঁহাদের নিকট রিজিক পৌঁছিয়া
থাকে"। অথচ সবাই জানেন যে, এর অর্থ হচ্ছে তাঁদের (নবীদের) উপর বরকত ও শান্তি বর্ষিত
হউক। ইসলামের একমাত্র খাঁটি প্রচারক বলে দাবীদার একটি প্রতিষ্ঠান এত বড় একটি বিভ্রান্তিকর
কাজ কীভাবে করতে পারে? চিন্তা করে দেখুন।
ছয় উসুল ও পাঁচ মূল স্তম্ভঃ
তাদের বাড়াবাড়ির আও একটি উদাহরণ দিচ্ছি-
তারা ইসলামের ৫টি মূল ভিত্তির পরিবর্তে ছয় উসুলের প্রবর্তন করেছে। আমাদের সকলেরই জানা
যে, ইসলামের মূল স্তম্ভ ৫টি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, "ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের
উপর
|
স্থাপিত: ১) আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ
নেই এবং মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল- এই ঘোষণা করা। ২) নামাজ কায়েম করা। ৩) যাকাত
দেয়া। ৪) হজ্জ করা এবং ৫) রামাযানে রোযা রাখা।" (বুখারী, মুসলিম, মেশকাতের বঙ্গানুবাদ,
নূর মুহাঃ আজমী, পৃঃ ১৬)
৫টি মূল ভিত্তির ৩টিই বর্জনঃ
আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ইসলামের মূল
আমল প্রবর্তন করলেন পাঁচটি। আর তাবলীগ জামাত কায়েম করলো মূল আমল ৬টি। এগুলো হচ্ছে-
কালিমা, নামাজ, ইলম ও যিক্, একরামুল মুসলিমীন, সহীহ নিয়ত ও তাবলীগ। লক্ষণীয় বিষয় হলো
যে, ইসলামের মূল পাঁচ আমল থেকে তাঁরা তাঁদের মূল আমলের বিবরণে যাকাত, রোযা ও হজ্জ
বাদ দিলেন। সুধী মহলের নিকট ব্যাপারটি বিবেচনার জন্য রেখে দিলাম।
ছয় উসুলের প্রেক্ষিতে টঙ্গীর বিশ্ব এজতেমাঃ হজ্জ ও জেহাদ প্রসঙ্গ
টঙ্গীতে প্রতি বছর এজতেমা অনুষ্ঠিত
হয়। সাধারণ মুসলমানদের ধারণা এই যে, কেউ ৩ বার এই বিশ্ব এজতেমায় অংশগ্রহণ করলে একটি
হজ্জের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। এই বিষয়টি তাঁদের কেতাবে প্রকাশিত না হলেও তাঁরা আম লোকদের
মধ্যে এটা প্রচার করে থাকেন। আসলে তাঁরা হজ্জের গুরুত্ব কম দিয়ে থাকেন। এর প্রমাণ তাদের
ছয় উসুল বা মূলনীতি। কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে নির্দেশ মোতাবেক
ইসলামের মূল স্তম্ভ বা মূলনীতি হচ্ছে পাঁচটি। অথচ তাবলীগ জামাতের মূলনীতি (উসুল) হচ্ছে
ছয়টি।
এই ছয়টির মধ্যে ইসলামের মূল ৫টি ভিত্তির
শুধু কালেমা ও নামাজ রেখে যাকাত, রোযা এবং হজ্জ বাদ দিয়ে নতুন ৪টি নীতি সংযোজন করা
হয়েছে। আর তা হচ্ছে ইলম ও যিকর, একরামুল মুসলিমীন, সহীহ নিয়ত ও তাবলীগ। আশ্চর্যের বিষয়
হচ্ছে এই যে, ইসলামের মূলস্তম্ভ ৫টি রেখে তার সাথে তাদের আরও ৪টি মূলনীতি সংযোগ করে
তাদের উসুল করতে পারতেন ৯টি। সেটা না করে ইসলামের মূলনীতির ৩টি বাদ দিয়ে তাদের মূলনীতি
করলেন ৬টি।
আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই যে, ইসলামের
অস্তিত্ব রক্ষার জন্য স্বয়ং আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বহুস্থানে মুসলমানদের জন্য জেহাদকে
ফরজ বা অপরিহার্য বলে ঘোষণা করেছেন। অথচ তাবলীগ জামাতের কেতাব সমূহে জিহাদের গুরুত্ব
দিয়ে কোন লেখা দেখা যায় না এবং জেহাদের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ কর্তব্যের স্থান তাদের
৬ উসুলে স্থান পেলো না।
তাবলীগ জামাতের অন্তর্ভুক্ত আলেম উলামা
ও সুধীবৃন্দ এই বিষয়টি কি চিন্তা করে দেখেছেন? আমি তাঁদেরকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি
গভীরভাবে চিন্তা করে দেখার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
আমি তাদেরকে উন্মুক্ত মনে ও সংস্কারমুক্ত
দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে বিবেচনা করে দেখতে বলছি যে, ইসলাম কি বৈরাগ্যের ধর্ম, না বাস্তব
জীবনের সাথে সম্পৃক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা? ইসলাম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, অর্থনৈতিক,
সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি শ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা।
{দেখুন ৫নং সূরা মায়েদা, আয়াত নং ৩}
|
৪৯ কোটি সওয়াব মিলেঃ
তাদের সীমালঙ্ঘনের আরও একটি নমুনা
তুলে ধরছি। সাধারণ লোকদেরকে দলে আনার জন্য তারা প্রচার করে থাকে যে, তাবলীগে বের হলে
৪৯ কোটি আমলের সওয়াব মিলে। তাদের এক লেখক আবদুল্লাহ মোঃ সাদ ইবনে সালিম তাঁর লিখিত
কেতাব সহজ ছয় নাম্বার এর ৫ পৃষ্ঠায় লেখেন, "আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে নিজের জন্য
এক টাকা খরচ করলে ৭ লক্ষ টাকা সাদকা করার সওয়াব মিলে”। “একটি আমল করলে ৪৯ কোটি আমলের
সওয়াব মিলে"। এই বক্তব্য কুরআন, হাদীস বা শরীয়তের কোন কেতাবেই উল্লেখ নেই। এটা
তাদের বানোয়াট কথা।
হাদীসের নামে মিথ্যা রচনাকারীর পরিণতিঃ
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) বলেছেন, "তোমরা যা জান তা ব্যতীত আমার পক্ষ হতে হাদীস বর্ণনা করার ব্যাপারে
সাবধান থেকো। কেননা যে ইচ্ছা পূর্বক আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে সে যেন তার বসার জায়গাকে
জাহান্নামে স্থির করে নেয়।" (মেশকাত বাংলা অনুবাদ পৃঃ ৩৫)
এরূপ আরও অসংখ্য ভিত্তিহীন, বানোয়াট
ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিবরণ তাদের কেতাবে আছে যা লেখতে গেলে ৫ শত পৃষ্ঠার কেতাবেও শেষ
করা যাবে না। বইয়ের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় সংক্ষেপ করতে বাধ্য হলাম। তবে আল্লাহর নামে,
রাসূলের নামে, কুরআন হাদীসের দোহাই দিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিলে সহীহ হাদীসের দৃষ্টিতে
সংশ্লিষ্ট লেখক বা প্রচারকের অবস্থানটি কী হতে পারে? উপরে উল্লিখিত হাদীসটি লক্ষ্য
করুন।
তাদের লেখা দরূদের ফজিলতের
বহুলাংশ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিকঃ তার সর্বনাশা পরিণতিঃ
দরূদের ফজিলতের উপর মাওলানা জাকারিয়া
সাহেব ফাজায়েলে দরূদ শরীফ নামে ১৫০ পৃষ্ঠার একটি কেতাব লিখেছেন। দরূদের ফজিলতের উপর
তিনি এই কেতাবে বহু ভিত্তিহীন, বানোয়াট, বিশেষ করে স্বপ্নে দেখা কেচ্ছা কাহিনী বর্ণনা
করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কর্তৃক প্রদত্ত দরূদে ইব্রাহীম, যাকে তিনি সর্বোত্তম দরূদ
বলে উল্লেখ করেছেন তার পরিবর্তে বিভিন্ন জনের তৈরী দরূদেরই গুরুত্ব দিয়েছেন অধিক। এই
নীতিই কি নবীর তরীকা? অথচ তারা বলে থাকেন যে, নবীর তরীকাই নাজাতের একমাত্র পথ।
মারাত্মক ও সর্বনাশা বিবরণঃ
উল্লিখিত দরূদের এই পরিমাণ গুরুত্ব
দেয়া হয়েছে যে, এবনুল মোশতাহেরের ভাষায় বলেছেন, তার দেওয়া প্রার্থনা ও দরূদ এতই
শ্রেষ্ঠ ও উত্তম যে, আজ পর্যন্ত আসমান জমিনের জ্বিন, ইনছান এবং ফেরেশতা কেহই উহা করতে
পারেনি। সকল প্রার্থনা ও দরূদ অপেক্ষা উহা শ্রেষ্ঠতর ও উত্তম। (দেখুন ফাজায়েলে দরূদ,
পৃঃ ৫৩)। এখানে আরও বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি সাত জুমা পর্যন্ত প্রত্যেক জুমুআর
দিন সাত বার করিয়া এই দরূদ শরীফ পড়িবে তাহার জন্য নবী (সাঃ) সুপারিশ ওয়াজেব হইয়া যাইবে"।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক মানুষের নাজাতের জন্য অসংখ্য দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) মুসলমানদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য অগণিত দোয়ার উপর গুরুত্ব দিয়ে
|
তা পড়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ
(সাঃ) কে সর্বোত্তম দরূদ কোনটি জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাবে বলেন, "দরূদে ইব্রাহীমই
(যা নামাজে পাঠ করা হয়) সর্বোত্তম দরূদ"।
এই গুরুতর আপত্তিকর আকীদা ও প্রথা
দ্বারা কুরআন সুন্নাহর অবমাননা করার কারণ কী? এই দরূদকেই সর্ব উত্তম ও শ্রেষ্ঠতম প্রার্থনা
ও দরূদ বলে তাবলীগ জামাতের দিকদিশারী যে ঘোষণা দিলেন এটা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
পবিত্র কুরআনে ও হাদীসে প্রদত্ত দোয়ার প্রতি চ্যালেঞ্জ নয়? আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) কে
কি হেয় করা হলো না? বিশ্ব প্রভু আল্লাহ পাক এবং তাঁর নবীর উপরে কি বুজুর্গ এবনুল মোশতাহেরের
স্থান দেওয়া হলো না? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নবুয়তের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এত বড় ধৃষ্টতা
আর কেউ দেখিয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই।
সজাগ হোনঃ
এই ধৃষ্টতার জন্য উক্ত লেখক ও প্রকাশকের
কিছু হওয়া উচিত কিনা? উম্মতে মুসলিমার এর প্রতিকারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া প্রয়োজন কিনা?
আপনারা গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, যে তাবলীগ জামাতের শ্রেষ্ঠ হাদী রচিত এহেন গুরুতর
আপত্তিকর লেখা প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে সেই তাবলীগ জামাতের আলেম, উলামা ও শিক্ষিত
ব্যক্তিগণ কি অন্ধ হয়ে গিয়েছেন? আশা করি উম্মতে মুহাম্মদীর সচেতন তৌহিদী জনতা এ ব্যাপারে
সজাগ হবেন।
দরূদের বানোয়াট অসীম গুরুত্বের ফলে এবাদতকে নিষ্প্রয়োজন করা হয়েছেঃ
তথাকথিত ফাজায়েলে দরূদ শরীফ কেতাবে
আদ্যোপান্ত প্রায় একই দৃষ্টি ভঙ্গি ও আকীদার অনুসরণ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে মাত্র
কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছি। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় সংক্ষিপ্তাকারে লেখতে হচ্ছে।
১। স্বপ্নের বর্ণনায় এক সুফী বলেন
যে, কোন পুণ্য কাজের পরিবর্তে সর্বপ্রকার পাপে লিপ্ত যুবক মৃত্যুর পরে বেহেশতে অবস্থান
করছে শুধু এক মজলিসে উচ্চৈঃস্বরে সকলের সাথে দরূদ পাঠের বরকতে। (ফাজায়েলে দরূদ, পৃঃ
১০২)
২। বনী ইসরাইলের এক মহা পাপী তৌরাতে
নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নাম দেখে একবার মাত্র দরূদ পাঠের ফলে তার সমস্ত গুনাহ মাফ।
(ঐ, পৃঃ ১০৪)
৩। হাদীসের হাওয়ালা ছাড়াই হাদীসে আছে
এই বলে লেখা হয়েছে যে, হুজুরের রূহ মোবারকের উপর, তাঁর দেহের উপর এবং তাঁর কবর শরীফের
উপর যে দরূদ পাঠ করবে তার দেহ জাহান্নামের জন্য হারাম হবে। (ঐ, পৃঃ ৬১)
৪। কেয়ামতের ময়দানে জনৈক ব্যক্তির
বদীর পাল্লা ভারী হওয়ায় সে নিরাশ। সেই মুহূর্তে হুজুর (সাঃ) নেকীর পাল্লা এক চিরকুট
রাখায় নেকীর পাল্লা ভারী হয়ে যাবে। হুজুর (সাঃ) বললেন, ইহা আমার উপর পড়া তোমার দরূদ
শরীফ। (ঐ, পৃঃ ৩৪)
৫। আশি বছরের গুনাহ মাফ ও আশি বছরের
সওয়াব লেখা হয় যদি কোন ব্যক্তি শুক্রবারে আশিবার দরূদ পাঠ করে। হাদীসের উল্লেখ ছাড়াই
এই প্রসঙ্গে আবু হুরায়রার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। (ঐ, পৃঃ ৪৮)
|
৬। হাদীসের উল্লেখ ছাড়াই আবু দারদাকে
বর্ণনাকারী বানিয়ে বলা হচ্ছে, হুজুর (সাঃ) এরশাদ করেন, "যে ব্যক্তি সকাল বিকাল
দশ বার করে আমার উপর দরূদ শরীফ পাঠ করবে কেয়ামতের দিন সে আমার সুপারিশ লাভকরবে"।
(ঐ, পৃঃ ৩২)
একবার দরূদ পাঠে ৭০ হাজার পাপীর বেহেশত লাভঃ
৭। জনৈক নেক বান্দা গোনাহগার বান্দাদের
কবরের পার্শ্ব দিয়ে যাওয়ার সময় একবার দরূদ শরীফ পাঠ করে কবরবাসীদের উপর তার সওয়াব বখশিশ
করে দেওয়ায় তার অছিলায় ৭০ হাজার জাহান্নামীর বেহেশতে প্রবেশ। (ঐ, পৃঃ ১১৪)। এটা বর্ণনাকারীর
স্বপ্নে দেখা একটি বিবরণ।
৮। জাহাজ ডুবন্ত অবস্থায় পতিত হওয়ায়
আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে জনৈক ব্যক্তি নবী (সাঃ) কর্তৃক স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে
দরূদ পাঠ করায় জাহাজ উদ্ধার। (ঐ, পৃঃ ৯৭)
৯। "হজ্জের সময় দরূদ শরীফ পাঠ
করা কুরআন তেলাওয়াতের চেয়েও বেশী সওয়াব"। (ফাজায়েলে হজ্জ, পৃঃ-১২৭)
১০। অন্য হাদীসে আছে, (হাদীসের হাওয়ালা
ছাড়া) “যে এই (নিম্নের) দরূদ পড়বে তার জন্য আমার (নবীর) সুপারিশ ওয়াজেব। দরূদ: আল্লাহুম্মা
সাল্লে আলা মুহাম্মাদেওঁ ওয়া আনিজেলহুল মাকআদাল মুকাররাবা ইনদাকা ইয়াউমাল কিয়ামাহ”। (পৃঃ ৩৩)
কাল্পনিক কেচ্ছা কাহিনী ও স্বপ্নের বিবরণীই তাবলীগ জামাতের ভিত্তিঃ
মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া সাহেব তাঁর
লিখিত বই "ফাজায়েলে দরূদ শরীফের ৯৬ পৃষ্ঠা থেকে ১২৬ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মোট ৩১ পৃষ্ঠা
ব্যাপী দরূদের তথাকথিত অসীম ফজিলত ও গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে মোট ৪৬টি কাল্পনিক কেচ্ছা
কাহিনীর কথা উল্লেখ করেন। (যার প্রায় সমস্তই স্বপ্নে দেখা)। অথচ হাদীসে তার কোন উল্লেখ
নেই। এই সমস্ত কাহিনীর বিন্দুমাত্র মূল্য নেই। আর তিনি নিজেই এই প্রসঙ্গে তাঁর আলোচনার
প্রারম্ভেই লেখেন, "দরূদ শরীফের বিষয়, আল্লাহ পাকের হুকুম এবং নবীয়ে করীম (সাঃ)
এর পবিত্র বাণীসমূহের পর, কেচ্ছা কাহিনীর উল্লেখের তেমন কোন গুরুত্ব রাখে না। কিন্তু
মানুষের স্বভাব হইল বুজুর্গানের ঘটনাবলীতে অধিক উৎসাহিত হওয়া"।
শরীয়ত ও বিদআতঃ
শরীয়ত হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
প্রদত্ত বিধান। এর বাইরের কোন কিছুই শরীয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তদুপরি কোন ব্যক্তি তার
মনগড়া কোন কথা বা কেচ্ছা কাহিনী শরীয়তের নামে চালু করলে সেটা ইসলামের বিধান হতে পারে
না। তা হবে সম্পূর্ণ বিদআত। আর বিদআত প্রবর্তনকারী এবং যারা তা অনুসরণ করবে তাদের ঠিকানা
হবে সোজা জাহান্নাম। এর প্রমাণ স্বরূপ ইতোপূর্বে সহীহ হাদীসের উল্লেখ করা হয়েছে।
|
বিদআতের ব্যাখ্যায় কুরআন, হাদীস ও আয়েম্মায়ে দ্বীনঃ
হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ আলেম আল্লামা
আলী কারী হানাফী বিদআতের ব্যাখ্যায় বলেন, "রাসূলের যুগে ছিল না এমন নীতি ও পথকে
সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রবর্তন করা”। (মিরকাত, পৃঃ ২১৬; সুন্নাত ও বিদআত, পৃঃ ৯)
বহু মূল্যবান গ্রন্থ প্রণেতা ও প্রখ্যাত
মুহাদ্দিস আল্লামা ইমাম শাওকানী বলেন, “বিদআত আসলে বলা হয় এমন নতুন উদ্ভাবিত কাজ কিংবা
কথাকে পূর্ববর্তী সমাজে (রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের যামানায়) যার কোন দৃষ্টান্তই
পাওয়া যায় না। আর শরীয়তের পরিভাষায় সুন্নাতের বিপরীত জিনিসকেই বলা হয় বিদআত। অতএব তা
অবশ্যই নিন্দনীয় হবে।” (নাইলুল আওতার, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৬৩, সুন্নাত ও বিদআত, পৃঃ ৬৬)
শরীয়তে বিদআত প্রবর্তনকারী এবং তার
অনুসারীগণকে সতর্ক করে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, "তাদের এমন সব শরীক আছে নাকি,
যারা তাদের জন্য দ্বীনের শরীয়ত রচনা করে এমন সব বিষয়ে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? চূড়ান্ত
ফয়সালার কথা যদি পূর্বেই সিদ্ধান্ত করে না নেয়া হতো তাহলে আজই তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত
করে দেওয়া হতো। আর জালেমদের জন্য রয়েছে পীড়াদায়ক আজাব।” (৪২:২১)
"এই আয়াত থেকে স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে
যে, যারা আল্লাহর দেয়া শরীয়াতের বাইরে, তার বিপরীত- মানুষের মনগড়া শরীয়ত ও আইনকে আল্লাহর
অনুমোদিত ও সওয়াবের কাজ বলে বিশ্বাস করে, তারা জালেম। আর এই জালেমদের জন্যই কঠিন আজাব
নির্দিষ্ট।" (সুন্নাত ও বিদআত, পৃঃ ৩১৮)
"আল্লাহর শরীয়তের বাইরে মানুষের
মনগড়া শরীয়ত ও আইন পালন করাই হলো বিদআত। আর উল্লিখিত আয়াতের দৃষ্টিতে বিদআত হলো শিরক।"
(ঐ, পৃঃ ৩১৮)
"রাসূলের প্রদত্ত ইসলামের পূর্ণাঙ্গ
দ্বীনে সে নতুন আচার-নীতি প্রবেশ করিয়ে দিয়ে নিজেই নবীর স্থান দখল করে, যদিও মুখে তার
দাবী করে না।"
হাশরের ময়দানে যখন নবীর (সাঃ) মুখলেস
অনুসারীগণকে হাউযে কাওসারের তৃপ্তিদায়ক পানি পান করানো হবে তখন সেদিকে অগ্রগামী নবীর
(সাঃ) উম্মতের দাবীদার একদল লোকের সামনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেওয়া হবে। তারা আর
অগ্রসর হতে পারবে না। নবী (সাঃ) বলবেন এদেরকে আসতে দেয়া হচ্ছে না কেন? তখন আল্লাহ
তায়ালা জবাব দিবেন, "এই লোকেরা তোমার মৃত্যুর পর কী কী বিদআত উদ্ভাবণ করেছে তা
তুমি জান না। এরা তো তোমার পেশ করা দ্বীনকে বদলে দিয়েছে, বিকৃত করেছে।"
তখন নবী (সাঃ) বলবেন, "দূর হয়ে
যাও, দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও।" (সহীহ মুসলিম ও মুসনাদে
আহমদ, সুন্নাত ও বিদআত, পৃঃ ৩১৯)
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
বিদআত ও এর পরিণাম ফলঃ
এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত আলেম, বিশিষ্ট
লেখক ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুর রহীম তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সুন্নাত ও বিদআতের
৭২ পৃষ্ঠায় লেখেন, “এই বিষয়ে আমার শেষ কথা হলো, বিদআতকে দু'ভাগে ভাগ করাও একটা বিদআত।
এবং বিদআতের দুয়ার পথ দিয়ে অসংখ্য মারাত্মক বিদআত ইসলামের গৃহ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে
দ্বীনী মর্যাদা লাভ করছে, বড়ো সওয়াবের কাজ বলে সমাজের বুকে শিকড় মজবুত করে গেড়ে বসেছে।
এ বিষবৃক্ষ যতো তাড়াতাড়ি উৎপাটিত করা যায়, ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষে ততোই মঙ্গল।"
উল্লিখিত আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কারভাবে
প্রমাণিত যে, মুসলিম শরীয়াতে নতুনভাবে উদ্ভাবিত কোন কিছু সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ
নেই। তাইতো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পাক কালামে বলেন, "তোমাদের কল্যাণের জন্য আজ
আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং আমার নেয়ামতকে তোমাদের প্রতি সুসম্পন্ন করে দিলাম
আর তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম ইসলামকে।” (৫নং সূরা মায়েদা, আয়াত- ৩)
এই আয়াতের আলোচনা প্রসঙ্গে মাওলানা
আবদুর রহীম সাহেব বলেন, "এই আয়াত থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, দ্বীন ইসলাম
পরিপূর্ণ। তাতে নেই কোন অসম্পূর্ণতা, কোন কিছুর অভাব। অতএব তা মানুষের জন্য চিরকালের
যাবতীয় দ্বীনী প্রয়োজন পূরণে পূর্ণমাত্রায় সক্ষম এবং এ দ্বীনে বিশ্বাসী ও এর অনুসারীদের
কোন প্রয়োজন হবে না এ দ্বীন ছাড়া অন্য কোন দিকে তাকাবার, বাইরের কোন কিছু এতে শামিল
করার এবং এর ভিতর থেকে কোন কিছু বাদ দেওয়ার, বাইরে কোন কিছু ফেলে দেওয়ার। কেননা এতে
যেমন মানুষের সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণেরই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তেমনি এতে নেই কোন বাজে
অপ্রয়োজনীয় বা বাহুল্য জিনিস। অতএব না তাতে কোন জিনিস বৃদ্ধি করা যেতে পারে, না পারা
যায় তা থেকে কোন কিছু বাদ দিতে। এই দু'টোই দ্বীনের পরিপূর্ণতার বিপরীত এবং আল্লাহর
উপরোক্ত ঘোষণার স্পষ্ট বিরোধী।" (সুন্নাত ও বিদআত, পৃঃ ২৭)
আল্লামা আলী নাদভীর বক্তব্যঃ
এই প্রসঙ্গে আল্লামা সায়্যিদ আবুল
হাসান আলী নাদভী তাঁর লিখিত "শিরক ও বিদআত" নামক মূল্যবান কেতাবে বলেন,
(যার বাংলা অনুবাদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ কর্তৃক ১৯৮৪ সনে প্রকাশিত হয়) “এই মনগড়া
তথাকথিত ব্যবস্থার ফিকহ পদ্ধতি স্বতন্ত্র, এর অবশ্যকরণীয় কাজসমূহ, সুন্নাত, মুস্তাহাব,
রীতি-পদ্ধতি, হুকুম আহকামও স্বতন্ত্র। এমনকি অনেক সময় মূল শরীয়ত ও আল্লাহর প্রদত্ত
হুকুম আহকামের তুলনায় এর হুকুম আহকামের সংখ্যা হয়ে যায় অনেক বেশী।"
বিধান প্রণয়ন এবং বিধান প্রদানের হক
একমাত্র আল্লাহর। বিদআত সর্ব প্রথম ইসলামের এই বুনিয়াদী আকীদা ও নীতির উপর আঘাত হানে।
সে সর্ব প্রথম ইসলামের এই হকীকত ও মৌল বিষয়টিকে উপেক্ষা করে বসে। কোন বস্তু বা বিষয়কে
আইনের মর্যাদা দেওয়া, একে অবশ্য পালনীয় বলে সাব্যস্ত করার অধিকার মানুষের হাতে তুলে
নেয়ার অর্থ হল আল্লাহর অধিকারে হস্তক্ষেপ করা, তাঁর পদমর্যাদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।
এই কারণেই বিধান প্রণয়নের ধৃষ্টতা প্রদর্শনকারী মানুষকে আল কুরআনে তাগুত ও অবাধ্য বলে
আখ্যায়িত করা হয়েছে।"
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
"এরা তাগুতের (আল্লাহ ও তাঁর
রাসূলের অবাধ্য শয়তানরূপী নেতা) নিকট গিয়ে বিবাদের মীমাংসা করতে চায় অথচ এদেরকে নির্দেশ
করা হয়েছে এটাকে অস্বীকার করার, এটাকে প্রত্যাখ্যান করার।" (৪নং সূরা নিসা, আয়াত-
৬০)
"কোন বিষয়কে দ্বীন ও শরীয়তের
অঙ্গ বলে নির্ধারণ করা, একে বিশেষ আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ও এতে কিছু শর্তারোপ করে আল্লাহর
নৈকট্য লাভ এবং সওয়াব ও নেকী হাসিলের উপায় বলে একে চালিয়ে দেওয়াতো আরও অনেক মারাত্মক
ও ভয়ানক কথা। কারণ এর মানেই হলো নয়া শরীয়ত ও দ্বীনের অংশ বলে নির্ধারণ করার কাজ একমাত্র
আল্লাহর আর কারো না। ইরশাদ হচ্ছে,
“(হে মানব
সমাজ) তোমাদের জন্য আমি শরীয়ত হিসাবে দ্বীনের পথ হিসাবে ঐ পথই নির্ধারণ করেছি যার নির্দেশ
আমি দিয়েছিলাম নূহকে এবং যার নির্দেশ আমি (হে নবী) আপনার নিকট পাঠিয়েছি।” (৪২নং সূরা আশ শূরা, আয়াত- ১৩)
ইসলামের পূর্বে আরববাসীরা যখন নিজেদের
পক্ষ থেকে হালাল হারাম করার কাজ শুরু করে এবং নিজেরা আলাদাভাবে মনগড়া হুকুম জারি করার
প্রয়াস পায় তখন আল কুরআন এই বলেই সমালোচনা করেছে যে,
"এদের কি কিছু শরীক আছে, যারা
এদের জন্য শরীয়ত ও দ্বীনের বিধান প্রচলন করেছে যার কোন অনুমতি ও নির্দেশ আল্লাহ দেননি।"
(৪২নং সূরা আশ শূরা-২১)
প্রকৃত পক্ষে জাহেলিয়াতের যুগে আরব
প্রধানগণ তাদের খুশী খেয়াল মতে ধর্মীয় বিধান চালু করেছিল যার কোন সমর্থন আল্লাহর বিধানে
ছিল না। ইয়াহুদী ও খৃষ্টানগণ ও তাদের তথাকথিত আলেম দরবেশগণ ধর্মের নামে যে বিধান ও
রীতিনীতি চালু করেছিল, অনুসারীগণ বিনা প্রতিবাদে তাই মেনে চলতো। আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে
আলেম উলামা ও সাধু সন্নাসীদের নির্দেশ মেনে চলতো।
আল্লাহ পাক এর প্রতিবাদে ঘোষণা করেন,
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
"এরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এদের
আলেম ও দরবেশদেরকে নিজেদের রাব বানিয়ে নিয়েছিল।" (৯নং সূরা আত তাওবাহ, আয়াত- ৩১)
প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আদী ইবনে হাতিমকে
লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতটির তাফসীর করতে গিয়ে
ইরশাদ করেন, "ওরা তাদের আলিম ও পীর মাশায়েখদেরকে স্বতন্ত্র বিধায়ক বলে সাব্যস্ত
করে নিয়েছিল। তারা যে জিনিসকে বৈধ বলে ঘোষণা করত বা হারাম বলে বিধান দিত কোন রূপ দলিল
প্রমাণ না দেখেই এবং প্রশ্ন না তুলেই এরা তা মেনে নিত।"
কোন জিনিসকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল প্রদত্ত
নির্দেশ ছাড়াই হালাল বা হারাম বলে নির্ধারণ করার মধ্যে আর শরয়ী প্রমাণ ছাড়া কোন বস্তুকে
বা বিষয়কে ফরজ ওয়াজিব বলে সাব্যস্ত করা এবং এর বিশেষ কোন রূপ দিয়ে, বিশেষ বিশেষ নীতিমালা
ও আদব কায়দায় শর্তযুক্ত করে এটিকে সওয়াব ও নেকীর কাজ বলে এবং এটাকে আল্লাহর নৈকট্য
লাভের উপায় বলে নির্ধারণ করার মধ্যে মূলত কোন পার্থক্য নেই। এ সব কিছুই আল্লাহ যার
অনুমতি ও নির্দেশ দেননি এমন বিধান বলে গণ্য হবে।
"বিদআতের কারণে শরীয়তের যে দ্বিতীয়
মূল নীতিটি আঘাতপ্রাপ্ত এবং উপেক্ষিত হয় সেটি হলো ইসলাম ও শরীয়তের পরিপূর্ণতা ও পূর্ণাঙ্গতার
আকীদা। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা শরীয়তকে পূর্ণ করে দিয়েছেন। যে সমস্ত
বিষয় শরীয়তের অঙ্গীভূত হওয়ার ছিল সে সবই হয়ে গেছে। একজন মানুষের নাযাতের জন্য যে সমস্ত
আমলের প্রয়োজন ছিল, আল্লাহর নৈকট্য লাভের যত মাধ্যম ছিল তার সবগুলোরই সুস্পষ্ট বিবরণ
দিয়ে দেওয়া হয়েছে।" দ্বীন শরীয়তের টাকশাল বন্ধ ও সিল মেরে দেওয়া হয়েছে। এখন যে
কেউ এর নামে এর দিকে আরোপ করে নয়া কোন মুদ্রা প্রচলনের প্রয়াস পাবে তা জাল ছাড়া আর
কিছুই হবে না। সূরা মায়েদায় উল্লেখিত ৩নং আয়াত দ্বারাই এটা প্রমাণিত হয়েছে"। দ্বীন
শরীয়াতের এক অংশ সন্দেহ যুক্ত এবং অনির্ধারিত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া তো তাকমীলে নিয়ামত
বা আমার (আল্লাহর) নিয়ামত সমূহকে পূর্ণ করে দিলাম ঘোষণার পরিপন্থী। এ কেমন করে সম্ভব
যে, শরীয়তের একটি বিষয় কয়েক শতাব্দী যাবত মুসলমানদের অগোচরে রইলো, মুসলমানরা, বিশেষ
করে খাইরুল কুরুন বা ইসলামের শ্রেষ্ঠ যুগের উম্মাত, সাহাবা ও তাবিঈন যারা ছিলেন,
"আমার নিয়ামত তোমাদের উপর পরিপূর্ণ করে দিলাম" এর প্রথম সম্বোধিত সত্তা,
তারাই রইলেন এর সওয়াব থেকে বঞ্চিত, এর পর দীর্ঘ যুগ পরে হলো এর উদ্ভাবন আর নির্ধারণ।
দ্বীন শরীয়তের মধ্যে যে কেউ কোন বিষয়ের
বৃদ্ধি ঘটায়, দ্বীন বহির্ভূত কোন কথা বা বিষয় দ্বীন ও শরীয়তের অঙ্গরূপে সাব্যস্ত করে,
এমন কোন জিনিষ পালনের গুরুত্ব দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে বিষয়ে গুরুত্ব দেননি, আল্লাহর
নৈকট্য লাভের জন্য নতুন কোন ওসীলা বা মাধ্যমের দ্বারা এই কথাই মূলতঃ বলতে চায় যে,
শরীয়তের মধ্যে এই একটি অপূর্ণতা থেকে গিয়েছিল যা এখন পূর্ণ করা হলো। আর এই কথা তো রাসূলকে
(সাঃ) অপরাধী বলে সাব্যস্ত করে। এতো তাঁর বিরুদ্ধে এক মারাত্মক অভিযোগ। কারণ তাঁর উপর
তো নির্দেশ ছিল “ আপনার প্রতি আপনার প্রভুর তরফ থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে তার সমস্তই
পৌঁছে দিন। আর তা যদি না করেন তবে আপনি তো তাঁর পয়গাম পৌছাননি। (৫নং সুরা মায়েদা,
আয়াত- ৬৭, শির্ক ও বিদআত, পৃঃ ২৬-৩১)
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
প্রকৃত প্রস্তাবে শরীয়ত এবং পুণ্য
লাভ হবে, জান্নাতে যাওয়া যাবে, এরূপ নিশ্চয়তা দিয়ে যারা সম্পূর্ণ নতুন উদ্ভাবিত কিছু
ইসলামের নামে প্রবর্তন করলেন তারাতো কুরআন হাদীসের আলোকে প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ ও তাঁর
রাসূলের বিরুদ্ধে Challenge করলেন। আল্লাহর উল্লেখিত আয়াতকে অস্বীকার করলেন এবং রাসূলের
ইজ্জতে আঘাত হানলেন। বিষয়টি বাস্তবিকই গুরুতর ও মারাত্মক।
ইমাম মালেকের উক্তিঃ
প্রসঙ্গটি সম্মানিত ইমাম মালেকের একটি
উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। ইমাম মালেক বলেন, "যে লোক ইসলামে কোন বিদআত উদ্ভাবন করবে
এবং তাকে ভাল ও উত্তম মনে করবে, সে যেন ধারণা করে নিয়েছে যে, নবী (সাঃ) রেসালাত ও নবুওতের
দায় দায়িত্ব পালন করেননি, বরং খিয়ানত করেছেন। কেননা, তিনি যদি তা পালন করেই থাকেন তা
হলে ইসলাম ও সুন্নাত ছাড়া তো কোন কিছুরই প্রয়োজন পড়ে না। সব ভালই তাতে রয়েছে। তা হলে
নতুন উদ্ভাবিত বিধান ও রীতিনীতির প্রয়োজন কিসের? (আল এতেসাম, শির্ক ও বিদআত, পৃঃ ৩১)
ইমাম গাজ্জালীর মন্তব্যঃ
প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা
ইমাম গাজ্জালীর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ "ইহইয়া উলুমুদদ্বীন” এর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে
বিদআত সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করলাম। ইমাম গাজ্জালী তদীয় গ্রন্থে বলেন,
"বিদআত যত রকমেরই হোক, সব গুলোরই
দ্বার রুদ্ধ করতে হবে, আর বিদআতীদের মুখের উপর নিক্ষেপ করতে হবে তাদের বিদআত সমূহ।
তারা তাকে যতোই বরহক বলে বিশ্বাস করুক না কেন?” (সুন্নাত ও বিদআত; পৃঃ ৩২০)
আখেরী যামানার তাবলীগী দলের স্বভাব, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সহীহ হাদীসের
বর্ণনাঃ
বাংলা সহীহ আল বুখারী, প্রকাশনায়-আধুনিক
প্রকাশনী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, হাদীস নং ৬৪৪৯, ৬৪৫০, ৬৪৫২, ও ৭০৪১ বাংলা তরজমা, মেশকাত শরীফ,
প্রকাশনায়-এমদাদিয়া লাইব্রেরী এর হাদীস নং ৪২৫৩, ৪২৬০, ৪২৭০ এবং মুয়াত্তা ইমাম মালিক
(রঃ) প্রকাশনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং তিরমিযী, আবু দাউদ ও মুসলিম শরীফের
বর্ণনায় উল্লেখিত বিষয়ে যা বিবরণ দেওয়া আছে তার সংক্ষিপ্তসার নিম্নে প্রদত্ত হলো।
উল্লেখিত হাদীসসমূহের বর্ণনাকারীগণ
হচ্ছেন আবু সাঈদ খুদরী, হযরত আলী, আবূ হুরায়রা ও আব্দুল্লাহ বিন ওমর। বাংলা তরজমায়
যে কেউ দেখে নিতে পারবেন।
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "তোমরা
যা জান তা ব্যতীত আমার পক্ষ হতে হাদীস বর্ণনা করার ব্যাপারে সাবধান থেকো। কেননা যে
ইচ্ছাপূর্বক আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করবে সে যেন তার বসার জায়গাকে জাহান্নামে স্থির
করে নেয়।"
(মেশকাত, পৃঃ ৩৫)
হাদীসের বর্ণনাঃ
কুরআনের কৃত্রিম ভক্তি আসলে কুরআন
মানবে না।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "আমার
মৃত্যুর পর শেষ যামানায় আমার উম্মতের মধ্য হতে পূর্বের কোন এক দেশ হতে এমন একটি জামাত
দ্বীনের তাবলীগের নামে বের হবে যারা কুরআন পাঠ করবে, তাদের কুরআন পাঠ তোমাদের কুরআন
পাঠের তুলনায় খুবই সুন্দর হবে। কুরআনের প্রতি তাদের ভক্তি শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা দেখে
মনে হবে যেন ওরা কুরআনের জন্য এবং কুরআনের ওদের জন্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কুরআনের প্রতিটি
আয়াতের উপর তারা ঈমান রাখবেনা এবং কুরআনের কঠিন নির্দেশের উপর আমল রাখবে না।"
মূর্খের আনুগত্যঃ
এই জামাতের অধিকাংশ লোক হবে মূর্খ,
কুরআন ও হাদীসের জ্ঞানে তারা যেমন মূর্খ তেমনি সাধারণ জ্ঞানেও হবে মূর্খ। এই জামাতে
যদি কোন শিক্ষিত লোক যোগদান করে তাহলে তার আচরণ ও স্বভাবও হয়ে যাবে জামাতে যোগদানকারী
অন্যান্য মূর্খের মত। মূর্খরা যেমন মূর্খদের আনুগত্য করবে তেমনি শিক্ষিত লোকেরাও মূর্খদের
আনুগত্য করবে।
প্রমাণ বিহীন ফজিলতের বায়ানঃ
এ জামাতের বয়ান বক্তৃতায় থাকবে কেবল
ফজিলতের বয়ান। বিভিন্ন আমলের সর্বোচ্চ ফজিলতের প্রমাণ বিহীন বর্ণনাই হবে তাদের বয়ানের
বিষয়বস্তু।
কুরআনের পরিবর্তে নিজস্ব পথে চলবেঃ
হে মুসলমানগণ, এ জামাতের নামাজ, রোজা
ও অন্যান্য আমল এতই সুন্দর বলে মনে হবে যে, তোমরা তোমাদের নামাজ, রোজা ও অন্যান্য আমলসমূহকে
তাদের তুলনায় তুচ্ছ মনে করবে। এই জামাতের লোকেরা সাধারণ অন্যান্য মানুষকে কুরআনের পথে,
তথা দ্বীনের পথে চলার নামে ডাকবে। কিন্তু তারা চলবে তাদের তৈরী করা নিজেদের পথে। ডাকলেও
তারা কুরআনের পথে চলবে না।
বহ্যিক আকর্ষণে আকৃষ্টঃ
তাদের ওয়াজ ও বয়ান হবে চিনির মত সুস্বাদু।
তাদের ভাষা হবে সকল মিষ্টির চেয়েও মিষ্টি। তাদের পোষাক ও পরিচ্ছদ, ধরণ-ধারণ হবে খুবই
আকর্ষণীয় যেমন সুন্দর হরিণ তার দিকে মানুষের মন আকৃষ্ট করে। হরিণ শিকারী সুবর্ণ
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
হরিণ দেখে হরিণের পিছনে যেমন ছুটতে
থাকে, তেমনি সাধারণ মানুষ তাদের মিষ্টি ব্যবহার, আমলের প্রদর্শনী ও সুমধুর ওয়াজ শুনে
তাদের জামাতের দিকে ছুটতে থাকবে।
ব্যাঘ্রের অন্তরের মত
কুরআন হাদীসের কথা তাদের অন্তরে ঢুকবে নাঃ
তাদের অন্তর হবে ব্যাঘ্রের অন্তরের
মত হিংস্র। ব্যাঘ্রের অন্তরে যেমন কোন পশুর চিৎকারে মমতা পৌঁছে না, তেমনই কুরআন ও হাদীসের
বাণী যতই মধুর হোক তা তাদের অন্তরে প্রবেশ করবে না। তাদের কথাবার্তা, আমল আচরণ ও বয়ান,
যেগুলি তারা তাদের জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, তার ভিতরকার কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী আমলগুলি
বর্জন করে কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার জন্য যতবার কেউ কুরআন ও সুন্নাহর কথা বলুক,
ব্যাঘ্রের অন্তরে যেমন মমতা প্রবেশ করে না, তেমনি তাদের অন্তরে কুরআন ও সুন্নাহর কথা
প্রবেশ করবে না।
তাদের প্রশিক্ষণে আল্লাহ ও রাসূলের (সাঃ) পরিবর্তে জামাতের আনুগত্যঃ
তাদের জামাতে প্রবেশ করার পর তাদের
মিষ্টি ব্যবহারে মানুষ মুগ্ধ হবে, কিন্তু ঐ মনোমুগ্ধকর ব্যবহারের পিছনে ঈমান বিনষ্টকারী,
ইসলামের মূল্যবোধ বিনষ্টকারী মারাত্মক বিষ বিরাজ করবে। তাদের প্রশিক্ষণ মানুষের অন্তর
থেকে ধীরে ধীরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) আনুগত্যের প্রেরণা শেষ করে দিবে এবং জামাতের
আনুগত্যের প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট করবে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী
কোন কাজ কেউ ধরিয়ে দিলে কোন ক্রমেই তা পরিবর্তন করতে তারা প্রস্তুত হবে না। অর্থাৎ
কুরআন ও হাদীস দেখিয়ে দিলেও তারা কুরআন ও হাদীসের কথা বর্জন করে তাদের মুরুব্বীদের
কথাই মেনে চলবে।
কুরআন ও হাদীসের প্রতি তাদের অনীহা
এতই প্রবল যে, তারা অর্থসহ কুরআন হাদীস কখনই পাঠ করবে না এবং তাদেরকে পাঠ করানোও যাবে
না।
এই জামাত ইসলামের তাবলীগ করার কথা
যতই বলুক, যতই সুন্দর করে কুরআন পাঠ করুক, তাদের রোজা যতই সুন্দর হোক, আমল যতই চমৎকার
হোক, মূলতঃ এই জামাতটি হবে ইসলাম থেকে বহির্ভূত।
উল্লেখিত জামাতটি চিনবার উপায়ঃ
সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল
(সাঃ) এই জামাতটি চিনবার সহজ উপায় কী? আমাদেরকে তা জানিয়ে দিন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, এই ইসলাম বহির্ভুত জামাত চিনাবার উপায় হলোঃ
১। যখন তারা বসবে, গোল হয়ে বসবে।
২। তারা অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বড়
দল হয়ে যাবে।
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
৩। তাদের আমীর ও মুরুব্বীদের মাথা
নেড়া হবে। তীর মারলে ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে যায়; তীর আর কখনও ধনুকের দিকে ফিরে আসে না।
তেমনই যারা ঐ জামাতে যোগদান করবে তারা কখনও দ্বীনের দিকে ফিরে আসবে
না। অর্থাৎ ঐ জামাতকে দ্বীনের পক্ষে
ফিরিয়ে আনার জন্য কুরআন হাদীস যতই দেখানো হোক, যতই চেষ্টা হোক কেন, দলটি দ্বীনের পথে
ফিরে আসবে না।
দাওয়াত ও আদেশ নিষেধের তাৎপর্যঃ
আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন কায়েমের উদ্দেশ্যে
সকল মুসলমানকেই এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে। আল কুরআনে আহ্বান করে বলা হচ্ছে, তোমাদের মধ্যে
একটি দল গঠিত হোক যার কাজ হবে মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা এবং সৎ কাজের নির্দেশ
প্রদান ও অসৎ কাজে নিষেধ করণ। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা কার্যকর করা- (মুসলিম শরীফ,
ফাজায়েলে আমল, পৃঃ ১৩)। নবী করিম (সাঃ) এই নীতিই অনুসরণ করেছেন। কিন্তু তাবলীগ জামাতের
ভাইয়েরা এবং অন্যান্য এরূপ দল আদেশ নিষেধের কাজে আসতে প্রস্তুত নয়। এ পথটি হচ্ছে কণ্টকাকীর্ণ
ও বিপজ্জনক। এখানে আসলে জেল, জুলুম, অত্যাচার ও জীবনের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু বিশ্ব নবী
(সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম জীবন বাজী রেখে সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের উপর বর্ণনাতীত অত্যাচার
উৎপীড়ন হয়েছে, তাঁরা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে যারা তাবলীগের সোল এজেন্সি নিয়েছেন
তারা এই পথে আসছেন না। তারা নিরাপদে মসজিদে বসে বসে সাধারণত নামাজীদের মধ্যেই তাবলীগ
করেন, আর চিল্লায় নেওয়ার লিষ্ট করেন, তাবলীগে আসলে লক্ষ লক্ষ সওয়াব হাসিলের গ্যারান্টি
প্রদান করেন।
দ্বীন প্রতিষ্ঠায় জেহাদের আহ্বানঃ কুরআন
তাঁরা জান্নাতে যাওয়ার সস্তা পথ দেখান;
কিন্তু অসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষা এবং জীবন কুরবানীর কথা বলেন না, অথচ সূরা সফ ১০ ও ১১
নং আয়াতে বেহেশতে যাওয়ার পথের সন্ধান দিতে গিয়ে ঈমান আনার পরেই জেহাদে অংশগ্রহণ
করার কথা বলা হয়েছে, সূরা বাকারার ২১৬ নং আয়াতে জেহাদ করা, প্রয়োজনে সশস্ত্র যুদ্ধে
অংশ গ্রহণ করাকে ফরজ করে দেয়া হয়েছে। সূরা হজ্জের ৭৮ নং আয়াতে নির্দেশ হলো এবং বলা
হলো যে, এই দায়িত্ব পালনের জন্যই তোমরা জেহাদ করতে থাকবে, যেরূপভাবে জেহাদ করা উচিত
এবং এই কাজের জন্যই তোমাদেরকে মনোনীত করা হয়েছে।
অন্যায় অত্যাচারের সয়লাবঃ তাবলীগ জামাতের নিষ্ক্রিয়তা
আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের দেশে
শরীয়তের নির্দেশ অমান্য করে সরকার কর্তৃক মদের ও পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স দেওয়ায় নিষিদ্ধ
কাজের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে, দেশে জেনা তথা ধর্ষণ চলছে বেপরোয়াভাবে, সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের
ফলে নাগরিক জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে, শত শত নারী ও শিশু পাচার করে তাদের জীবন বিপন্ন
করা হচ্ছে। দেশে সর্বপ্রকার অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি ও ঘুষের সয়লাবে সব কিছু ভাসিয়ে
নিচ্ছে। এ ব্যাপারে এর প্রতিরোধের জন্য তাঁদের পক্ষ থেকে টু শব্দটি নেই। অথচ কুরআন
ও হাদীসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, শক্তি প্রয়োগ করে হলেও সর্বপ্রকার অন্যায়, অনাচার
ও শরীয়ত বিরুদ্ধ কাজ বন্ধ করতে হবে। আমাদের নবী (সাঃ) ও খুলাফায়ে রাশেদীন তাদের
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
সময়ে মুসলমানদেরকে শরীয়তের নির্দেশিত
পথে চলতে বাধ্য করেছেন এবং অন্যায় কাজে লিপ্ত হলে শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন, যারা যাকাত
দিতে অস্বীকার করেছিল
হযরত আবু বকর (রাঃ) তাদের বিরুদ্ধে
জেহাদ করে যাকাত প্রদান করতে বাধ্য করেছিলেন; তারা শক্তি সঞ্চয় করে রাষ্ট্র ক্ষমতার
মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
সংক্ষিপ্ত কথা হচ্ছে যে, তারা শুধু
দাওয়াত দিয়েই ক্ষান্ত হননি, আল্লাহর বিধান বলবৎ করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে
আল্লাহর শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রমাণিত।
তারা অমুসলিম শক্তি দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত
হয়ে, আক্রান্ত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করে ইসলাম ও মুসলিম রাষ্ট্রকে রক্ষা করেছেন।
ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদী, খৃষ্টান, ব্রাহ্মাণ্যবাদীদের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রঃ
বর্তমান বিশ্বে কাফের মুশরিকগণ ইসলাম
ও ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করে তাগুতের বিধান প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্ব ব্যাপী চক্রান্তের
জাল বিস্তার করেছে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছে, অর্থনৈতিক অবরোধের
পন্থা অবলম্বন করে উদীয়মান মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে পঙ্গু করার সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ
করেছে। তাদেরকে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলছে।
লিবিয়া, সুদান, আফগানিস্তান, ইরাক, ইরান বসনিয়া হার্জেগভিনা, কাজাকিস্তান ও চেচনিয়া
প্রভৃতি মুসলিম রাষ্ট্রের ব্যাপারে কাফের মুশরিক রাষ্ট্রের অনুসৃত নীতিই এর প্রমাণ।
পূর্ব তিমূরে মাত্র ৭ লক্ষ খৃষ্টান জনমতের দোহাই দেখিয়ে সেই রাষ্ট্রটিকে জাতিসংঘের
মাধ্যমে স্বাধীন করে দেওয়া হল। অথচ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের জনগণ দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী
থেকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে আসছে, কিন্তু শুধু মুসলমান হবার জন্যই জাতিসংঘে গৃহীত
গণভোটের মাধ্যমে ফয়সালার সিদ্ধান্ত নেয়া সত্ত্বেও অর্ধ শতাব্দীর এই ঝুলন্ত সমস্যার
সমাধান করা হচ্ছে না। কারণ একটিই। সেটা হচ্ছে এই যে, এরা মুসলমান। অথচ লক্ষাধিক অসহায়
মুসলিম নারী, শিশু ও মুজাহিদের রক্তে কাশ্মীর ভূখণ্ড রঞ্জিত হচ্ছে। অবলা, সতী, সাধ্বী
মুসলিম নারীদের ইজ্জত নষ্ট করছে, ইরাকে অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ঔষধ
ও শিশুর খাদ্য আসতে না দেওয়ায় হাজার হাজার শিশু অকাল মৃত্যু বরণ করেছে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র
ইরাকের তৈল সম্পদ কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যে এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ইরাকে
একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের লক্ষ্যে বিশ্ব জনমত উপেক্ষা করে ও জাতি
সংঘের তোয়াক্কা না করে, ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে, এই অজুহাতে, ব্রিটেনকে সাথে নিয়ে
ইরাক আক্রমণ করে তা দখল করে নেয়। আক্রমণ পরিচালনার সময় তারা হাজার হাজার ইরাকীকে হত্যা
করে, তাদের বাড়ী-ঘর, দোকান-পাট, ব্যবসা কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত ও হাসপাতাল
সমূহ বিধ্বস্ত করে। দশ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন সমূহ ধ্বংস করে।
ইরাকের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেনসহ হাজার হাজার নিরপরাধ ইরাকীকে বন্দী করে
তাদের উপর নির্মম ও পাশবিক অত্যাচার চালায়। অসহায় ইরাকীরা তাদের দেশের স্বাধীনতা ও
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী ইরাকী দখলদার
বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে দখলদার বাহিনী পর্যুদস্ত
হয়ে পড়ে এবং তাদের শত শত সৈনিক মৃত্যুবরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বাহিনীর নির্মম
ও নিষ্ঠুর নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ হয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী তাদের
বিরুদ্ধে প্রবল জনমত গড়ে
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
উঠে। দীর্ঘ ১৫ মাস যুদ্ধ করেও দখলদার
বাহিনী ইরাকী স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী যোদ্ধাদের হাতে নাজেহাল হতে থাকে। শেষে অবস্থা
বেগতিক দেখে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পদলেহী ও বিশ্বাসঘাতক কিছু সংখ্যক দালাল ইরাকীদের সমন্বয়ে
একটি অন্তর্বর্তীকালীন তাবেদার সরকার গঠন করে প্রহসনমূলক ক্ষমতা হস্তান্তর করে। কিন্তু
নির্ধারিত হয় যে, দেড় লক্ষাধিক দখলদার সৈন্য ইরাকে অবস্থান করবে অনিদিষ্ট কালের জন্য
এবং সর্মময় ক্ষমতা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই। তারা সাদ্দাম হোসেন ও তাঁর এগার জন
সহকর্মীর প্রহসন মূলক বিচার করার জন্য একটি অবৈধ ট্রাইবুনাল প্রতিষ্ঠা করে তাদের বিচারের
নামে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনে। যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নির্দেশে সাদ্দাম হোসেন ও তার সহকর্মীদের
মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে তার আধিপত্য স্থায়ী
করার জন্য তার তাবেদার এজেন্টদের দ্বারা যে সরকার গঠন করেছে তার প্রতি ইরাকী জনগণের
বিন্দুমাত্রও সমর্থন নেই এবং তারা প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে অবিরাম গতিতে।
প্রতিদিন সংঘর্ষে উভয় পক্ষের সৈনিক ও বেসামরিক মানুষ মৃত্যু বরণ করছে। জাতিসংঘ ও ও,
আই. সি. ইরাক সমস্যা সমাধানের এ পর্যন্ত কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। স্বাধীনতাকামী
ইরাকী মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র যুদ্ধ অবিরাম গতিতে চলছে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ে ইরাকের
স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধারাই জয়যুক্ত হবে, এটাই প্রত্যাশিত।
অন্যদিকে, সন্ত্রাসবাদী যুক্তরাষ্ট্রের
প্রত্যক্ষ মদদে ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইল, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের বৃহত্তর অংশ বলপূর্বক দখল
করে প্রতিদিন ফিলিস্তিনীদের বাড়ীঘর, সহায় সম্পদ, বিভিন্ন মূল্যবান স্থাপনা ও অফিস ভবনসমূহ
বিধ্বস্ত করে চলছে এবং একই সাথে ফিলিস্তিনীদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে চলেছে। এই আগ্রাসন
ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে জাতিসংঘের সিন্ধান্ত মোতাবেক স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার
জন্য জাতিসংঘ কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না এবং ও. আই. সিও কিছুই করতে পারছে না
শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগ ও ইহুদী রাষ্ট্রের স্বার্থে তার পক্ষপাতিত্বমূলক
নীতির জন্য। এইভাবে মিল্লাতে মুসলিমা বিভিন্ন দেশে শুধু নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে।
আর নির্যাতিত মুসলমানরা আল্লাহ্র দরবারে সাহায্যের জন্য ফরিয়াদ করেই চলেছে।
অত্যাচারের প্রতিরোধে জেহাদ না করায় আল্লাহর প্রশ্নঃ
মুসলিম জাহান এই ব্যাপারে নীরব ভূমিকা
পালন করছে। অথচ অত্যাচারিত অসহায়, দুর্বল, নির্যাতিত মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুদেরকে
অত্যাচারীদের অত্যাচার থেকে উদ্ধার করার জন্য এগিয়ে না আসার জন্য উম্মতে মুসলিমাকে
ভর্ৎসনা স্বরে আল্লাহ বলেছেন- "আর তোমরা আল্লাহর রাহে সংগ্রামে বিরত থাকতে পার
কী করে? অথচ আর্ত নর-নারী বালক-বালিকাগণ আল্লাহর দরবারে (ফরিয়াদ করে) বলছে, হে আমাদের
প্রতিপালক! অত্যাচারীদের অধ্যূষিত এই জনপদ হতে আমাদেরকে উদ্ধার কর এবং আমাদেরকে নিজ
সন্নিধান হতে কোন অভিভাবককে আবির্ভাব করে দাও এবং আমাদের জন্য কায়েম করে দাও কোন প্রবল
সাহায্যকারীকে।” (৪নং সূরা নিসা, আয়াত- ৭৫)
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
গুজরাটে নজিরবিহীন নিষ্ঠুরতা ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড এবং আমাদের করণীয়ঃ
ভারতের গুজরাটে মৌলবাদী বি.জে.পি,
রজবংশদল, শিবসেনা, আর.এস.এস. ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে
নিরস্ত্র অসহায় মুসলিম নিধন যজ্ঞে উলঙ্গ তরবারি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে ২০০২ইং এর ২৭ শে ফেব্রুয়ারীতে।
এর ফলশ্রুতি হিসাবে নিষ্পাপ মুসলিম
নর-নারী ও মাসুম শিশুগণকে নির্মমভাবে হত্যা করে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, এমনকি
অসংখ্য নিরপরাধ জীবন্ত মানুষকেও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। শিশু বয়সের মেয়ে থেকে শুরু করে
যুবতী-বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত অসংখ্য মুসলিম মহিলাকে উলঙ্গ করে তাদের বাবা, ভাই ও স্বামীর
সম্মুখে পাইকারীহারে ধর্ষণ করে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। নিরাপত্তা পুলিশের
উপস্থিতিতেই এ সব নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয়। দণ্ডায়মান পুলিশ বাহিনীর নিকট সাহায্য
চাওয়ায় পুলিশের জবাব এসেছে, "আপনাদের সাহায্য করার জন্য কোন নির্দেশ নেই।"
নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ
বাহিনীর সহযোগিতায় গুজরাটের আক্রান্ত মুসলমানদের সহায় সম্পদ, ব্যবসা বাণিজ্য সব কিছু
লুট-পাট করে দোকান ও ঘর-বাড়ীতে আগুন জ্বালিয়ে ভষ্মিভূত করা হয়। বিগত অর্ধ শতাব্দীর
মধ্যে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু ভারতের মুসলমানদের উপর মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক হিন্দু
কর্তৃক অনুষ্ঠিত আঠারো হাজার হত্যা যজ্ঞের মধ্যে গুজরাটের এই হত্যাকাণ্ডই ছিল সর্বাধিক
নিষ্ঠুর ও নির্মম।
উপমহাদেশের প্রায় সকল মুসলিম দল, সংগঠন,
সংবাদ পত্র ও সাময়িকী, এমনকি অসাম্প্রদায়িক হিন্দু কলামিষ্ট ও সাংবাদিকরাও এই নির্মম,
নিষ্ঠুর ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই যে,
বিশ্ব মুসলিম সংস্থা নামে পরিচয় প্রদানকারী তাবলীগ জামাত এর প্রতিবাদ তো দূরের কথা
এ ব্যাপারে টু শব্দটিও উচ্চারণ করেনি। ঠিক এই নীতিই তারা অবলম্বন করেছিল বাবরী মসজিদ
বিধ্বস্ত করার সময়ে। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ভারতের লেজুড় বৃত্তির অনুসারী ও আজ্ঞাবাহক
বলেই তাবলীগ জামাত এই নীতির অনুসরণ করে। স্পেনের মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য ইউরোপীয়
খৃষ্টান শক্তি যে পদক্ষেপ নিয়েছিল হিন্দু ভারতও ঠিক এই পথেই অগ্রসর হচ্ছে। এর পরেও
সারা বিশ্বে ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও হিন্দু ভারতের রাজধানী দিল্লীতেই তাবলীগ
জামাতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এর কারণ অনুসন্ধান করে প্রকৃত তাবলীগের নীতি নির্ধারণ
ও সঠিক কর্মপন্থা অবলম্বনের জন্য সকল মুসলমান ও বিশেষ করে তাবলীগ জামাতের চিন্তাশীল
ভাইদের প্রতি আকুল আবেদন রইলো।
গভীর ষড়যন্ত্রের মুখেও তাবলীগ জামাতের নীরবতাঃ
মুসলিম জাহানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান,
আমাদের দেশেরও বিভিন্ন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদ পত্র মুসলিম
উম্মার উপর এই অপ্রত্যাশিত অত্যাচার, উৎপীড়ন, নির্যাতন ও জুলুমের প্রতিবাদ করে আসছে।
কিন্তু আমাদের তাবলীগ জামাতের ভাইয়েরা এ ব্যাপারে নীরব কেন? তাবলীগ জামাতের হেড অফিস
কুফরী স্থান ভারতের দিল্লীতে অবস্থিত। এজতেমার সময় বড় বড় হুজুরেরা সেখান থেকে আসেন।
তাদের নিকট
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
কি আমরা আরজ করতে পারি না যে, বাবরী
মসজিদসহ কত মসজিদই না বিধ্বস্ত করে দেওয়া হলো, সেখানে কত শত শত নিষ্পাপ অসহায় মুসলমানকে
হত্যা করা হলো, এখনো হচ্ছে, মুসলিম নারীদেরকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, মুসলমান হওয়ার জন্যই
তাদেরকে তাদের সর্বপ্রকার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, মাইকে আজান দেওয়া
বন্ধ করা হলো, মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান বকরা ঈদে (বাকারা) গরু কুরবানী বন্ধ করে
দেয়া হলো, এ সব অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে আপনারা অন্যান্য মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের
মত সোচ্চার হচ্ছেন না কেন? এর রহস্যটি কোথায়? যদি কিছু সমালোচকেরা বলতে চায় যে, তাবলীগ
জামাত কাফের মুশরিক সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শক্তির শিকারে পরিণত হয়েছে, তাদের ষড়যন্ত্রের
ফাঁদে পড়েছে, তাহলে আমাদের বলবার কী থাকতে পারে?
সকল মুসলমানের অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ
মুসলমানদের সকল প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির উচিত হবে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে মুসলিম জাহানের
যাবতীয় সমস্যা এবং তার সম্ভাব্য সমাধানের পথ বের করা, মুসলিম উম্মাহ তথা বিশ্ব দরবারে
তুলে ধরা, মুসলমানদেরকে তাদের সময়োপযোগী দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা, সর্বপ্রকার অন্যায়-অনাচারের
মূলোৎপাটনের জন্য মুসলিম উম্মাহ ও মুসলিম রাষ্ট্রসমূহকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে পরামর্শ
দেয়া এবং ভেদাভেদ দূর করে বিশ্ব মুসলিম সংস্থা যাতে করে মুসলিম উম্মাহর এবং সকল মুসলিম
রাষ্ট্রের কল্যাণে দৃঢ় পদে এগিয়ে আসে তার জন্য সুপরামর্শ প্রদান করা। অনেক প্রতিষ্ঠান
ও সংস্থাই এই দায়িত্ব কম বেশী পালন করে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের তাবলীগ জামাতের
ভাইয়েরা এই মহান দায়িত্ব পালনেও নীরব ভূমিকা পালন করেছেন। এর কারণ কী?
জেহাদ অপেক্ষা দরূদ পাঠই উত্তমঃ জেহাদের মূলে কুঠারাঘাত
তাবলীগ জামাতের অনুসরণীয় একচ্ছত্র
নেতা আমীর ও হাদী মাওলানা জাকারিয়া সাহেব ফাজায়েলে দরূদ শরীফের ৩৭ পৃষ্ঠায় অবলীলাক্রমে
লেখেন, "দরূদের দ্বারা বিশ বার জেহাদ করার চেয়ে বেশী সওয়াব হাছিল হয়।"
এই বক্তব্য দ্বারা তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে
আল কুরআনে ঘোষিত 'জেহাদ মুসলমানদের জন্য ফরজ" এই নির্দেশের মূলে কুঠারাঘাত
হানলেন এবং জেহাদ যে মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য, এই বুনিয়াদী আকীদা
বিনষ্ট করে দিলেন। প্রকৃত পক্ষে জেহাদের মত একটি ঝুঁকিপূর্ণ অথচ ফরজ কাজে তারা নীতিগতভাবেই
আসবেন না, কারণ তারা আরামে আয়েশে শুধু মসজিদে মসজিদেই ইসলাম নিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে অতি
সহজে বেহেশতে প্রবেশ করতে চান।
আল কুরআনের দীপ্ত ঘোষণাঃ
"তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমাদেরকে
এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে, যতক্ষণ না আল্লাহ জেনে নিবেন তোমাদের মধ্যে কে জেহাদ করেছ।"
(৯নং সুরা আত তাওবা, আয়াত: ১৬)
"মুসলমানদের জন্য জেহাদ অপরিহার্য
কর্তব্য (ফরজ)।” (২নং সুরা আল বাকারা, আয়াত:২১৬) এ
সম্পর্কে যথাস্থানে কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি পেশ করা হবে।
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
জেহাদে অনীহা প্রকাশের কারণঃ
তাবলীগ জামাত জেহাদে অনীহা প্রকাশ
করে প্রকৃত প্রস্তাবে তাকে অস্বীকার করে; কারণ জেহাদ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তারা
প্রচার করে বেড়ান যে নবীর তরীকাই তাদের তরীকা অথচ নবী (সাঃ) নিজেই ২৭টি সশস্ত্র জেহাদে
অংশ গ্রহণ করেছেন।
কাদিয়ানীদের অনুসরণঃ
জেহাদের প্রতি অনীহা প্রকাশ প্রকারান্তরে
ইহার প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করার সমতুল্য। এই নীতিই কি নবী ভক্তির বহিঃপ্রকাশ? প্রকারান্তরে
তাবলীগ জামাতের এই জেহাদ পরিত্যাগ করার নীতি যে ইসলামের প্রকাশ্য দুশমন কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের
বিঘোষিত "জেহাদ হারাম" এই নীতিরই সমর্থন করে। তাবলীগী ভাইয়েরা কি এ চিন্তা
করে দেখেছেন?
কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ভণ্ড নবী মির্জা
গোলাম আহমদ বলেন, "নিশ্চয় এই কাদিয়ানী সম্প্রদায় মুসলমানদের অন্তর থেকে জেহাদের
অপবিত্র আকীদার মূলোৎপাটন করতে দিবারাত্রি চেষ্টা চালিয়ে যাবে।" (রিভিউ অব বিলিজিয়ন্স,
১৯০৪ইং, কাদিয়ানী মতবাদ পৃঃ ১৫৯) লাহোরী কাদিয়ানী নেতা মুহাম্মদ আলী বলেন, "ইরেজ
সরকারের কর্তব্য হলো কাদিয়ানদের অবস্থা অনুধাবণ করা। কেননা আমাদের ইমাম (মির্জা গোলাম)
তার জীবনের বাইশটি বছর লোকজনকে শুধু এই শিক্ষা দিয়ে ব্যয় করেছেন যে, জেহাদ হারাম এবং
অকাট্য হারাম"।
বিজ্ঞ পাঠক পাঠিকাগণকে অনুরোধ করছি
যে, উল্লেখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে জেহাদ সম্পর্কে তাবলীগ জামাত ও অমুসলিম কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের
আকীদার মধ্যে পার্থক্য কতখানি, তা বিশেষভাবে চিন্তা করে দেখবেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত
মুহাম্মদ (সাঃ) সশরীরে জেহাদ করেছেন কিনা সেটাও ভেবে দেখবেন। অতঃপর পবিত্র কুরআন ও
হাদীস শরীফে জেহাদ সম্পর্কে কী নির্দেশ আছে সেটাও লক্ষ্য করবেন।
পবিত্র কুরআনে জেহাদের নির্দেশঃ
পবিত্র আল কুরআনে ঘোষিত হচ্ছেঃ
১। "জেহাদকে তোমাদের জন্য অপরিহার্য
কর্তব্য (ফরজ) রূপে অবধারিত করা হলো। যদিও তা তোমাদের নিকট অরুচিকর, কিন্তু তোমরা যা
পছন্দ কর না সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর সম্ভবতঃ তা তোমাদের
জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।” (২নং সুরা
আল বাকারা, আয়াত:২১৬)
২। "এবং তোমরা আল্লাহর পথে জেহাদ
করতে থাকবে যেরূপ জেহাদ করা উচিত সেরূপভাবে। তিনি তোমাদেরকে নির্বাচিত করেছেন (এ কাজের
জন্যই)।"
৩। "তোমরা তোমাদের শত্রুদের মোকাবিলার
জন্য যথাসাধ্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর, শক্তি অর্জন কর এবং যুদ্ধোপযোগী ঘোড়া (সময়োপযোগী
প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র) প্রস্তুত রাখবে।” (৮নং সুরা
আল আনফাল, আয়াত- ৬০)
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
৪। "আর লড়াই কর আল্লাহর পথে তাদের
সাথে যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে।” (২নং সুরা
আল বাকারা, আয়াত: ১৯০)
৫। "বস্তুত তারাতো সর্বদাই তোমাদের
সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে যাতে করে তোমাদের দ্বীন থেকে ফিরিয়ে নিতে পারে।" (২নং আল
বাকারা, আয়াত: ২১৭)
৬। "হে নাবী, আপনি মুমিনদেরকে
উদ্বুদ্ধ করুন সশস্ত্র জেহাদের জন্য।" (৮নং সুরা আল আনফাল, আয়াত: ৬৫)
৭। "যদি তোমরা (জেহাদের জন্য)
বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে কঠিন আজাব দিবেন এবং অপর দলকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত
করবেন।" (৯নং সুরা আত তাওবা, আয়াত: ৩৯)
৮। "নিশ্চয় তারাই মুমিন যারা
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে নিজেদের
প্রাণ ও ধন সম্পদ দ্বারা জেহাদ করে, তারাই সত্যনিষ্ঠ।" (৪৯নং সুরা আল হুজরাত,
আয়াত: ১৫)
৯। “হে ঈমানদারগণ! নিজেদের অস্ত্র
তুলে নাও এবং পৃথক সেনাদলে বা সমবেতভাবে বেরিয়ে পড়।" (৪নং সূরা আন নেসা, আয়াত:
৭১)
১০। নিশ্চয় আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন
মুসলমানদের থেকে তাদের জানমাল জান্নাতের বিনিময়ে। (জান-মালের পরওয়াহ না করে) তারা আল্লাহর
রাস্তায় লড়াই করে, অতঃপর মারে ও মরে।" (৯নং সূরা আত তাওবা, আয়াত- ১১১)
১১। "তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমাদেরকে
এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে, যতক্ষণ না আল্লাহ জেনে নিবেন তোমাদের কে জেহাদ করেছে।"
(৯নং সূরা আত তাওবা, আয়াত- ১৬)
১২। " তোমরা কি মনে করেছ যে,
তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের কারা জেহাদ করছে এবং
কারা ধৈর্যশীল।" (৩নং সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪২)
১৩। "যতক্ষণ পর্যন্ত সকল প্রকার
ফেতনার নিরসন না ঘটে এবং মানুষের প্রতিপালক ও অনুসরণযোগ্য যে আইন যতক্ষণ পর্যন্ত তার
নিয়ন্ত্রণাধিকার একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সংগ্রাম
করতে থাকবে।” (৮নং সূরা আল আনফাল, আয়াত: ৩৯)
১৪। "হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ,
কিসাসের (প্রতিশোধ, Retaliation) মধ্যেই তোমাদের জীবন, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।” (২নং সূরা আল বাকারা, আয়াত: ১৭৯)
১৫। "তুমি (হে রাসূল) বলে দাও,
তোমাদের পিতৃবর্গ, তোমাদের পুত্রগণ, তোমাদের ভ্রাতৃবর্গ, তোমাদের স্ত্রীগণ ও গোত্রগোষ্ঠী
এবং তোমাদের ধনসম্পদ যা তোমরা সঞ্চয় করে রেখেছ, তোমাদের কাজ কারবার, যাতে মন্দা পড়ার
আশঙ্কা তোমরা করে থাক, তোমাদের আবাস গৃহগুলো, যাতে তোমরা প্রীতি লাভ করে থাক (এসব)
যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ অপেক্ষা, তাঁর রাসূল অপেক্ষা এবং আল্লাহর রাহে জেহাদ করা অপেক্ষা
অধিক প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফরমান আসা
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
পর্যন্ত অপেক্ষা কর; বস্তুতঃ ফাসেক
কাওমকে আল্লাহ সৎপথে পরিচালিত করেন না।" (৯নং সূরা আত তাওরা, আয়াত: ২৪)
জেহাদ সম্পর্কে হাদীস শরীফ:
১। সর্বোত্তম কাজ কী, তা রাসূলুল্লাহকে
(সাঃ) জিজ্ঞাসা করায় উত্তরে তিনি বলেন, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা"।
অতঃপর কোন্ আমল জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, "আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করা।” (বুখারী)
২। "আল্লাহর পথে জেহাদ করা তোমাদের
একজনের ঘরে সাতশত বছর ধরে নামাজ পড়া অপেক্ষা অনেক উত্তম।” (তিরমিযী)
৩। "নিশ্চয় জান্নাতের দরজা জেহাদের
তরবারীর ছায়ার নীচে।” (মুসলিম)
৪। "যদি তোমরা জেহাদ পরিত্যাগ
কর তা হলে আল্লাহ তোমাদের উপর অপমান ও লাঞ্ছনা চাপিয়ে দিবেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না
তোমরা দ্বীনের জন্য জেহাদের পথে ফিরে আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তা সরিয়ে নিবেন না।” (আবূ দাউদ, বাইহাকী, আহমাদ, তাবরানী)
৫। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে মারা গেল অথচ জেহাদ করলো না, এমনকি তার অন্তরে
জেহাদের আকাঙ্ক্ষাও পোষণ করলো না, সে যেন মুনাফিকের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো।” (মুসলিম শরীফ, মিশকাতের বঙ্গানুবাদ, নূর মুহাম্মদ আজমী, পৃঃ
৩৩১)
অন্যায় প্রতিরোধে টঙ্গীর এজতেমায় কোন কথা বলা হয় না কেন?
আমাদেরকে বলা হয়ে থাকে যে, টঙ্গী এজতেমায়
২৫ লক্ষাধিক মুসলমানের সমাগম হয়। বাংলাদেশের মত শতকরা নব্বই শতাংশ মুসলমান অধ্যূষিত
দেশে যেভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ চলছে তা বন্ধ করে ইসলামী
আইন প্রবর্তন ও ইসলামী হুকুমত কায়েম করার দাবীতে সচিবালয়ের পার্শ্বে ২৫ লক্ষাধিক মুসলমানকে
সাথে নিয়ে আপনারা কি সোচ্চার হতে পারেন না? টঙ্গীর এজতেমাতে কি এ প্রসঙ্গে কথা বলতে
পারেন না?
ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা কি নাবীর তরীকা নয়?
আপনারা প্রচার করেন যে, "নবীর
তরীকাই আমাদের তরীকা।" তাই যদি হয় তবে প্রশ্ন করছি, নবী কি ইসলামী হুকুম প্রতিষ্ঠা
করে ইসলামী শরীয়ত প্রবর্তন করেননি? তিনি কি রাষ্ট্রপতি ছিলেন না? তিনিই কি মদীনায় ইসলামী
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সর্বপ্রথম ও সর্বোত্তম শাসন সংবিধান উপহার দেননি? তিনিই কি দোষী
ব্যক্তিদেরকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করেননি? তিনি কি প্রধান বিচারপতি
ও প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করেননি? জবাব হবে, নিশ্চয় করেছিলেন। তবে
আপনারা এই ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ পালন করেন না কেন? রাসূলের (সাঃ) প্রদর্শিত এই
পথে অগ্রসর হন না কেন?
তাবলীগ
জামাত ও তাবলীগে দ্বীন
শুধু তাবলীগেই কি নাযাত পাওয়া যাবে?
আপনারা অবশ্যই অবগত আছেন যে, ৫নং সূরা
মায়েদার আয়াত নং ৪৪ এ আল্লাহ বলেন, "আর যারা আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী
হুকুম প্রদান করে না তারাই তো প্রকৃত কাফের।" হুকুমতের মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর বিধান
সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করা যায় না এবং ইসলাম পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে হবে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাই করেছিলেন।
নবীর প্রকৃত অনুসারী হতে হলে এ পথেই আসতে হবে। আল্লাহর নির্দেশও এটাই। এ পথে না আসার
অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর কেতাবের কিছু অংশ মানলাম আর কিছু মানলাম না। এদের সম্পর্কেই আল্লাহ
বলেন,
"তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু বিশ্বাস
কর আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর? সুতরাং তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল
পার্থিব জীবনে হীনতা আর কিয়ামতের দিন তারা কঠিনমত শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা
যা করে, আল্লাহ সে সম্বন্ধে অনবহিত নহেন।" (২নং সূরা বাকারা, আয়াত- ৮৫)
বজ্র কঠিন শপথ নিনঃ
নাযাত পেতে হলে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা
করে তাবলীগ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে
অবশ্যই অংশ গ্রহণ করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। শুধু তথাকথিত তাবলীগ করলেই নাযাত পাওয়া যাবে
না। নাযাত পেতে হলে উল্লিখিত উদ্দেশ্য সামনে রেখে সর্বাত্মক আন্দোলন করে যেতে হবে এবং
পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফের এটাই নির্দেশ যা ইতোপূর্বে লেখা হয়েছে।
আমাদের শেষ কথা হচ্ছে, "আসুন,
সবাই নিজেদের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে, নিজেদের মত পার্থক্য দূর করে, মানব জাতির কল্যাণে,
শান্তি ও মুক্তির জন্য বিশ্বপ্রভু আল্লাহ প্রদত্ত আল কুরআন ও তাঁর প্রেরিত রাসূল মাই এর প্রদর্শিত পথ ও নীতি অনুসরণ
করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে, কাফের
মুশরিকদের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে, আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ ইসলাম কায়েম করার জন্য
সর্বপ্রকার চেষ্টা ও তদবীরে আত্মনিয়োগ করার বজ্র কঠিন শপথ গ্রহণ করি।
আমরা যদি প্রকৃত মুসলমান হয়ে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে আল্লাহর
রহমতের উপর পূর্ণ আস্থা রেখে, ঐক্যবদ্ধভাবে সর্বাত্মক সংগ্রামে অবতীর্ণ হই, তবেই আল্লাহ
আমাদেরকে জয়যুক্ত করবেন। বিজয় ইনশা আল্লাহ আমাদের হবেই।
"নাসরুম মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারীব ওয়া বাশশিরিল
মুওমিনীন।"
"আল্লাহর মদদ ও আসন্ন বিজয়, সে মতে (হে রাসূল)
মুমিনদেরকে তুমি এর সুসংবাদ প্রদান কর।" (৬১নং সূরা আস সফ- ১৩)
প্রমাণপঞ্জী
১। কুর আনুল করীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন,
বাংলাদেশ।
২। তাফসীরঃ ইবনে কাসির।
৩। তাফসীর: মাআরেফুল কুরআন, মাওঃ মুফতী
মহাঃ শফী।
৪। তাফসীর: মাওলানা আশরাফ আলী থানভী।
৫। তাফসীর: মাওলানা মুহাম্মদ আকরাম
খাঁ।
৬। তাফসীর: আল্লামা মুহাঃ ইউসুফ আলী,
ইংরেজী।
৭। The Glorious Koran-Md.
Marmaduke Pickthol.
৮। কলেমা তৈয়েবা: আল্লামা আবদুল্লাহিল
কাফী।
৯। ইসলামী শাসনতন্ত্রের সূত্র: আল্লামা
আবদুল্লাহিল কাফী।
১০। ভাকভিয়াতুল ঈমান: আল্লামা ইসমাইল
শহীদ।
১১। দ্বীন ইসলামের তাবলীগ: অধ্যাপক
মাওলানা হাফিজ শায়খ আইনুল বারী, আলিয়াবী, কলিকাতা।
১২। সহীহ আল বুখারী, অনুবাদ, মাদীনা
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
১৩। মেশকাত শরীফ: মাওলানা নূর মুহাম্মাদ
আজমী।
১৪। মুয়াত্তা: ইমাম মালেক, ইসলামিক
ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
১৫। আর রাহীকুল মাখতুম: আল্লামা ছফিউর
রহমান মোবারকপুরী।
১৬। সীরাতুন নবী: আল্লামা শিবলী নোমানী।
১৭। মোস্তফা চরিত: মাওলানা মুহাম্মদ
আকরাম খাঁ।
১৮। A Short History of the
Saracens: Justice Ameer Ali.
১৯। সুন্নাত ও বিদআত: মাওলানা আবদুর
রহীম।
২০। শির্ক ও বিদআত: আল্লামা সায়্যিদ
আবুল হাসান নাদভী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।
২১। ফাজায়েলে তাবলীগ।
২২। ফাজায়েলে নামাজ।
২৩। ফাজায়েলে কোরআন।
২৪। ফাজায়েলে জিকির।
২৫। হেকায়েতে ছাহাবা।
২৬। ফাজায়েলে হজ্জ।
২৭। ফাজায়েলে দরূদ শরীফ।
লেখকের আরও ৩টি গুরুত্বপূর্ণ বই
১। কাদিয়ানী ধর্মমতের স্বরূপ উদঘাটন।
২। বিশ্ব নবীর তাবলীগ ও জিহাদী জিন্দেগী।
(শীঘ্রই প্রকাশিত হবে)
৩। বিশ্ব পরিস্থিতি ও মুসলিম জাহানের
প্রেক্ষাপটে জিহাদের তাৎপর্য ও কার্যক্রম।
(প্রকাশনার পথে)


0 মন্তব্যসমূহ